রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, দলীয় নিয়ন্ত্রণের আহ্বান টিআইবির

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা ও হত্যার হুমকির ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। হামলায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিবেচনায় না নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বন্ধে নিজ নিজ দল ও অঙ্গসংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সংস্কার ও আত্মশুদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

সোমবার (৫ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। টিআইবি বলেছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রোববার (৪ অক্টোবর) রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হামলা ঠেকাতে প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশও পরিস্থিতির সময় ভয়ে সরে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সোমবারের মধ্যে মামলা করার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি ছাত্রদলও দলীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

সাংবাদিকরা হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, হামলার শিকার গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারী, সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনি প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা, গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি পুলিশের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির সুযোগ সংকুচিত করে। এ ধরনের পরিস্থিতির প্রতিকার রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অসহায়ত্ব এবং পুলিশের ব্যর্থতা দেখিয়ে দেয় যে, এ ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমস্যার সমাধান শুধু সরাসরি অপরাধীদের জবাবদিহির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাবান দলগুলোর আমূল সংস্কার ও আত্মশুদ্ধি ছাড়া মুক্ত গণমাধ্যম, বাক্‌ ও ভিন্নমতের স্বাধীনতা, জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা এবং সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কর্তৃত্বের সহিংস লড়াই বন্ধ এবং নিজ নিজ দল ও অঙ্গসংগঠনকে নিয়ন্ত্রণের রাজনৈতিক দায় ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এড়িয়ে যেতে পারে না। শুধু তদন্ত কমিটি গঠন বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যে দায়িত্ব সীমাবদ্ধ না রেখে সহিংসতার প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্ত ও আচরণে গণতান্ত্রিক চর্চা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিজেদের সংগঠনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিশ্চিত না করলে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব নয়। দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণের কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা প্রতিরোধে প্রশাসনের ব্যর্থতাকে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের ক্ষয়ের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখছে টিআইবি। সংস্থাটির ভাষ্য, উপাচার্য ও শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবি, ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, দখলবাজি ও পেশিশক্তির প্রদর্শনসহ বিভিন্ন ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার দাবি এবং শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে। উপাচার্য বা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে নিয়মতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তবে পদত্যাগের দাবি আদায়ে দলীয় প্রভাব, ভয়ভীতি বা বলপ্রয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এমনভাবে অতিরিক্ত ক্ষমতাশালী হয়ে উঠবে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দায়িত্ব পালনে এবং পুলিশ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হবে—এ পরিস্থিতি চলতে দেওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হবে, দলীয় শক্তির দাপটে নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করে দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, রাজনৈতিক চাপ বা অসহায়ত্বের অজুহাতে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজনৈতিক পরিচয় যেন কোনো অপরাধীর সুরক্ষাকবচ না হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন দলীয় প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.