মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ায় বিশ্ববাজারে আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। সরবরাহ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের মধ্যে এখন বাজারের পরবর্তী গতি অনেকটাই নির্ভর করছে বিশ্বের অন্যতম বড় তেল আমদানিকারক চীনের সিদ্ধান্তের ওপর।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারের বেশি উঠে মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গ্রীষ্মে ব্যারেলপ্রতি ৬৮ দশমিক ৫৫ ডলারে নেমে যাওয়ার পর থেকে দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ার পাশাপাশি একাধিক হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই বাজারে ঝুঁকির প্রিমিয়াম বাড়ছিল।
র্যাপিডান এনার্জির প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকন্যালির মতে, চলতি দাম এখনো ৭ এপ্রিলের যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ ১১২ দশমিক ৯৫ ডলারের নিচে রয়েছে। তবে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এর মধ্যে চীন অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়ালে বাজারে দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই তেলের বাজারে চীনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি অপরিশোধিত তেল আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য কিছুটা বজায় ছিল। বব ম্যাকন্যালির হিসাবে, চীন দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত আমদানি কমিয়েছে। পাশাপাশি দেশটির হাতে ১০০ কোটি ব্যারেলের বেশি জ্বালানি মজুত রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, চীন এই মজুত ব্যবহার করে আমদানি নিয়ন্ত্রণে রাখবে, নাকি বাড়তি তেল কিনে বাজারে নতুন চাপ তৈরি করবে। চীনা শোধনাগারগুলো সক্রিয় হয়ে অপরিশোধিত তেল কেনা বাড়ালে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে পরিশোধন সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ডিজেল উৎপাদনে মুনাফাও বেড়েছে। ফলে চীনা শোধনাগারগুলোর সামনে তুলনামূলক বেশি দামে অপরিশোধিত তেল কিনেও লাভ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে তেলের চাহিদা আরও বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
এনার্জি অ্যাসপেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা অমৃতা সেন জানান, যুদ্ধ শুরুর পর জুনে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে দেশটির আমদানি ছিল প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ব্যারেল। জুলাই ও আগস্টে তা বেড়ে প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল দৈনিক হয়েছে।
তবে চীনের আমদানি আবার যুদ্ধের আগের পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। পণ্যবাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের পরিচালক ম্যাট স্মিথের মতে, চলতি মাসেও চীনের তেল কেনার গতি জুলাই ও আগস্টের কাছাকাছি রয়েছে। ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে দেশটি বড় আকারে আমদানি বাড়ানোর বদলে মজুত ব্যবহার এবং শোধনাগারের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
শুধু যুদ্ধের কারণে সরবরাহ সংকটই নয়, বৈশ্বিক তেল মজুত কমে যাওয়াও বাজারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মজুত প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল কমেছে। একই সময়ে জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার কার্যক্রমও শেষ হওয়ার পথে।
ফলে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাজারে যে অতিরিক্ত নিরাপত্তাবলয় ছিল, সেগুলোও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বব ম্যাকন্যালির মতে, গ্রীষ্ম শেষ হলেও শান্তি ফেরেনি এবং যুদ্ধও থামেনি। ফলে সংঘাত কমে তেলের দামও দ্রুত স্বাভাবিক হবে—এমন প্রত্যাশা এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় চীনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত তেলবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটি আমদানি বাড়ালে বৈশ্বিক সরবরাহের ওপর আরও চাপ তৈরি হয়ে দাম ১০০ ডলারের ওপরে দীর্ঘ সময় থাকতে পারে। বিপরীতে চীন মজুতের ওপর নির্ভর করে আমদানি নিয়ন্ত্রণে রাখলে বর্তমান উচ্চমূল্য কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠবে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.