ট্রাম্পের ইরান নীতি: এখনো যে বড় ভুলটি করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট, সামনে কঠিন তিন বিকল্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শেষ পর্যন্ত তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল হিসেবে ইতিহাসে মূল্যায়িত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল এড়িয়ে গেছেন—সংঘাতকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাননি, যা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে গিয়ে বা নিজেদের রাজনৈতিক মর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট সংঘাত আরও বাড়িয়েছেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে।

বর্তমানে ইরানের আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি এবং কার্যকর আলোচনায় না ফেরার কারণে ট্রাম্প প্রশাসন কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে।

প্রথমত, বর্তমানের মতো সীমিত বিমান হামলা, নাজুক যুদ্ধবিরতি এবং সমুদ্রপথে অবরোধের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চালিয়ে যাওয়া।

দ্বিতীয়ত, হামলার পরিধি বাড়িয়ে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা কিংবা স্থলবাহিনী মোতায়েনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া।

তৃতীয়ত, নিজের প্রধান লক্ষ্য অর্জন না হলেও সংঘাত থেকে সরে এসে ক্ষতি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, তিনটি পথের প্রতিটিতেই রাজনৈতিক ও কৌশলগত বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।

এদিকে ইরানের সঙ্গে নতুন সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প আবারও কঠোর ভাষায় তেহরানকে সতর্ক করেছেন।

তিনি বলেছেন, ইরানের জন্য এটি একটি “শেষ সুযোগ” এবং চুক্তিতে সই না করলে দেশটির নেতৃত্ব “ধ্বংস” হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ইরান যদি এবারও সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাতে পারে।

একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র নৌপথ খুলে রাখতে সামরিক অভিযান চালালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমান অভিযান থেকে স্থলযুদ্ধে রূপ নিলে সংঘাতের মানবিক ও রাজনৈতিক মূল্য বহুগুণ বেড়ে যাবে।

ইতিহাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন, রিচার্ড নিক্সন, জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং বারাক ওবামা—প্রত্যেকেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, আরও বাড়ানো অথবা সরে আসার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একবার বড় আকারে যুদ্ধ শুরু হলে তা থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে বারবার যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সমালোচনা করেছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি “শেষ না হওয়া যুদ্ধ” বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন তিনি। পরে সেই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে দায় চাপিয়েছিলেন তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওপর।

বর্তমানে ইরান সংঘাত নিয়ে ট্রাম্প এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তার নেওয়া সিদ্ধান্ত শুধু তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অসংখ্য মানুষের ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.