প্রথম দিন কেমন গেল বেক্সিমকো, ইসলামী ব্যাংকের

দীর্ঘদিন ফ্লোরপ্রাইসের ঘেরাটোপে আটকে থাকার পর স্বাভাবিক লেনদেনে ফিরেছে বহুল আলোচিত দুই কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। গতকাল সোমবার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কোম্পানি দুটির উপর থেকে ফ্লোরপ্রাইস তুলে নেয়। আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) ছিল কোম্পানি দুটির লেনদেনে ফেরার প্রথম দিন।

মঙ্গলবার বাজারে দুটি কোম্পানির শেয়ারের দামই কমেছে। লেনদেনগুলো হয়েছে সার্কিটব্রেকারের সর্বনিম্ন সীমায়। সার্কিটব্রেকার হচ্ছে, একদিনে শেয়ারের দাম বৃদ্ধি বা হ্রাসের গ্রহণযোগ্য সীমা। কোনো শেয়ারের দাম এই সীমার বেশি বাড়তে বা কতে পারে না। বর্তমান বিধি অনুসারে, কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম ২০০ টাকার নিচে থাকলে একদিনে সেটির মূল্য ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে বা কমতে পারবে।

আজ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কোম্পানি দুটির লেনদেনের পরিমাণও ছিল অনেক কম। এদিন ডিএসইতে বেক্সিমকো লিমিটেডের ৮ হাজার ২৬টি শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। লেনদেনকৃত শেয়ারগুলোর মোট বাজারমূল্য ছিল ৮০ লাখ টাকা। শেয়ারগুলো কেনাবেচা হয়েছে ৯৯ টাকা ১০ পয়সা দরে। ফ্লোরপ্রাইস আরোপের দিনে শেয়ারটির মূল্য ছিল ১১০ টাকা। প্রথম দিনে এর দাম ১১ টাকা কমেছে, যার হার ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও ছিল প্রায় অভিন্ন চিত্র। আজ ডিএসইতে এই ব্যাংকের ৪০ হাজার ৪১৬টি শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। লেনদেনকৃত শেয়ারগুলোর মোট বাজারমূল্য ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। শেয়ারগুলো কেনাবেচা হয়েছে ২৯ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ২৯ টাকা ৫০ পয়সা দরে। ফ্লোরপ্রাইস আরোপের দিনে শেয়ারটির মূল্য ছিল ৩২ টাকা ৬০ পয়সা। প্রথম দিনে এর দাম ৩ টাকা ২০ পয়সা কমেছে, যার হার ৯ দশমিক ৮২ শতাংশ।

বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি অনেক বড় মূলধন সম্পন্ন কোম্পানি। স্বাভাবিক সময়ে কোম্পানি দুটির বিপুল সংখ্যক শেয়ার লেনদেন হয়ে থাকে। আজ ডিএসইতে ব্যাংকিং খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে ওয়ান ব্যাংকের, যার সংখ্যা ৩৩ লাখ ১০ হাজার ২২৭টি। ডিএসইতে এদিন ২০ লাখের বেশি শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে আরও ৭টি ব্যাংকের। এর বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার সংখ্যা ছিল মাত্র ৪০ হাজার।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারে মূল্য সংশোধন চলছে। ২০২২ সালের মার্চে যখন বাজারে দ্বিতীয় দফায় ফ্লোরপ্রাইস আরোপ করা হয় তখন পর্যন্ত কোম্পানি দুটির পারফরম্যান্স ছিল অনেক ভাল। ২০২১-২২ অর্থবছরে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৯ টাকা ৬ পয়সা। ওই বছরের জন্য কোম্পানিটি ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছিল। অন্যদিকে ২০২১ সালে ইসলামী ব্যা্ংকের ইপিএস হয়েছিল ২ টাকা ৯০ পয়সা। ব্যাংকে লভ্যাংশ দিয়েছিল ১০ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দুটি কোম্পানিই নানামুখী সংকটে পড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর আটক হয়ে জেলে আছেন বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান। ইতোমধ্যে কোম্পানিটি লোকসানের কবলে পড়েছে।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের পর থেকে ইসলামী ব্যাংকের কর্ণধার সাইফুল আলম (এস আলম) দেশছাড়া। তার নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর থেকেই ব্যাংকটির পতন শুরু হয়েছিল। এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে ব্যাংকটি থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে বলে অভিযোগ আছে। আর্থিক স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ায় সর্বশেষ বছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারেনি ব্যাংকটি। এর মধ্যে গতমাস থেকে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ পর্যন্ত হয়েছে। এখনো আমনতকারীদের নামে কিছু মানুষ নিয়মিত কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ করছে। অন্যদিকে কর্মকর্তাদের বাধার মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা চেয়ারম্যান ব্যাংকটিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। নানা অনিশ্চয়তার মুখে ব্যাংকটি থেকে আমানত তুলে নেওয়ার হিড়িক লেগেছে। গত সাত দিনে আমানতকারীরা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। এসবের প্রভাবে পড়েছে শেয়ারের দামে।

বিশ্লেষকদের মতে, কাঙ্খিত মূল্য সংশোধনের পর কোম্পানি দুটির শেয়ার লেনদেন অনেকগুণ বেড়ে যাবে। মূল্যসংশোধন কতটুকু হলে সেটি ‘কাঙ্খিত’ হবে, তা বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিই ঠিক করবে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.