ভয়ঙ্কর ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের আক্রমণে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে করোনা রোগীরা

অর্থসূচক ডেস্ক

0
261

ভারতে যখন করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ দ্বিতীয় ঢেউ কেড়ে নিচ্ছে বহু মানুষের জীবন, তছনছ করে দিচ্ছে জনজীবন, তখন গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত এসেছে ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, করোনা থেকে আরোগ্যের পথে বা সুস্থ হয়ে ওঠাদের শরীরে বিরল ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস যার বৈজ্ঞানিক নাম মিউকোরমাইকোসিস খুবই বিরল একটি সংক্রমণ। মিউকোর নামে একটি ছত্রাকের সংস্পর্শে এলে এই সংক্রমণ হয়। সাধারণত এই ছত্রাক পাওয়া যায় মাটি, গাছপালা, সার এবং পচন ধরা ফল ও শাকসবজিতে।

মুম্বাইয়ে চোখের ডাক্তার ডা. অ্যখশে নায়ার বলেন, এটা মাটি এবং বাতাসে এমনিতেই বিদ্যমান থাকে। এমনকি নাক ও সুস্থ মানুষের শ্লেষ্মার মধ্যেও এটা স্বাভাবিক সময়ে থাকতে পারে।

এই ছত্রাক সাইনাস, মস্তিষ্ক এবং ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। ডায়াবেটিস, ক্যান্সার বা এইচআইভি/এইডস যাদের আছে, কিংবা কোন রোগের কারণে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই কম এই মিউকোর থেকে তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

চিকিৎসকরা বলছেন, মিউকোরমাইকোসিস থেকে মৃত্যুর আশংকা ৫০ শতাংশ। তাদের ধারণা স্টেরয়েডের ব্যবহার থেকে এই সংক্রমণ শুরু হতে পারে। কোভিড-১৯-এ গুরুতরভাবে আক্রান্তদের চিকিৎসায় তাদের জীবন বাঁচাতে এখন স্টেরয়েড দিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছে।

স্টেরয়েড কোভিড-১৯ আক্রান্তদের ফুসফুসের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। করোনা ভাইরাসের জীবাণুর সাথে লড়াই করতে গিয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে যেসব ক্ষতি হয় সেই ক্ষতি থামানোর জন্যও ডাক্তাররা কোভিডের চিকিৎসায় স্টেরয়েড ব্যবহার করেন।

কিন্তু এই স্টেরয়েডের ব্যবহার স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি ডায়াবেটিস নেই এমন কোভিড আক্রান্তদের শরীরের রক্তে শর্করার (ব্লাড সুগার) মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়।

ধারণা করা হচ্ছে যে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণেই মিউকোরমাইকোসিস সংক্রমণ ঘটছে।

কাদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি?
ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সেটা আরও কমে যায়। এর ওপর কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার জন্য যখন স্টেরয়েড দেওয়া হয়, তখন সেটা আগুনে ইন্ধন যোগানোর মত হয়ে দাঁড়ায়।

ডা. নায়ার কাজ করেন মুম্বাইয়ের তিনটি হাসপাতালে। করোনা ভাইরাসের প্রাণঘাতী দ্বিতীয় ঢেউয়ের তাণ্ডবে ভারতের যেসব শহর মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত, তার একটি হল মুম্বাই। তিনি বলছেন, তিনি শুধু এপ্রিল মাসেই এই ফাঙ্গাসের সংক্রমণে ভোগা প্রায় ৪০ জন রোগীর চিকিৎসা করেছেন।

এদের বেশিরভাগই ছিলেন ডায়াবেটিসের রোগী, যারা কোভিড সংক্রমণের পর বাসায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এদের মধ্যে এগারোজনের চোখ অস্ত্রোপচার করে ফেলে দিতে হয়েছে।

ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ তিন মাসের মধ্যে মাত্র ছয়টি শহর – মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদ, দিল্লি এবং পুনেতে তার মাত্র ছয়জন সহকর্মী চিকিৎসক ৫৮ জন রোগীর মধ্যে এই সংক্রমণের খবর জানিয়েছেন। এদের বেশিরভাগই করোনা থেকে সেরে ওঠার ১২ থেকে ১৫ দিনের মাথায় ছত্রাক সংক্রমণের শিকার হয়েছেন।

মুম্বাইয়ের ব্যস্ত সিয়ন হাসপাতালে গত দুই মাসে এই ভয়ঙ্কর ছত্রাক সংক্রমণের ২৪টি কেসের কথা জানা গেছে। ওই হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের প্রধান ডা. রেণুকা ব্র্যাডু জানান, এর আগে এই কালো ছত্রাক সংক্রমণ বা মিউকোরমাইকোসিসের শিকার হওয়া রোগীর সংখ্যা পাওয়া গিয়েছিল বছরে ছয়টি। তিনি বলেন, এখন প্রতি সপ্তাহে দুটি থেকে তিনটি কেস আমরা পাচ্ছি। প্যানডেমিকের মধ্যে এটা ভয়ানক বিপর্যয়কর।

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় ব্যাঙ্গালোর শহরের চোখের সার্জেন ডা. রাঘুরাজ হেগড়ে একই ধরনের চিত্র তুলে ধরেছেন। গত দুই সপ্তাহে তার কাছে মিউকোরমাইকোসিসে আক্রান্ত হয়ে ১৯ জন রোগী এসেছে। এদের বেশিরভাগ অল্প বয়সী। তিনি জানান, কেউ কেউ এত অসুস্থ ছিল যে আমরা তাদের অস্ত্রোপচারও করতে পারিনি।

চিকিৎসকরা বলছেন, তারা করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে এই ছত্রাক সংক্রমণের ভয়াবহতা এবং এত দ্রুত ছড়ানোর ঘটনায় খুবই বিস্মিত। গত বছর কোভিডের প্রথম ঢেউয়ের সময় এই ছত্রাক সংক্রমণ ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

কি ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়?

ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে সংক্রমিত রোগীদের সাধারণত যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তার মধ্যে রয়েছে:
নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নাক থেকে রক্ত পড়া
চোখে ব্যথা এবং চোখ ফুলে যাওয়া
চোখের পাতা ঝুলে পড়া
চোখে ঝাপসা দেখা, যার থেকে পরে দৃষ্টিশক্তি চলে যায়
নাকের চামড়ার চারপাশে কালো ছোপ ছোপ দাগ দেখা দেওয়া

চিকিৎসকরা বলছেন, বেশিরভাগ রোগীই তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে দেরিতে। যখন তারা দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছে। এই পর্যায়ে ডাক্তারের অস্ত্রোপচার করে চোখ ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। কারণ ছত্রাকের মস্তিষ্কে আক্রমণ ঠেকাতে চোখ বাদ দেওয়া ছাড় তখন বিকল্প থাকে না।

ভারতের ডাক্তাররা বলছেন, কোন কোন ক্ষেত্রে রোগীরা দুচোখেরই দৃষ্টি হারাচ্ছেন। কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণ ছড়ানো রুখতে চিকিৎসকদের রোগীর চোয়ালের হাড়ও কেটে ফেলে দিতে হয়েছে। তবে সেগুলো একেবারে মারাত্মক সংক্রমণের ক্ষেত্রে।

প্রতিরোধ কি সম্ভব?
মুম্বাইয়ের ডায়াবেটিসের চিকিৎসক ডা. রাহুল বক্সি বলেন, এই ছত্রাক সংক্রমণ এড়ানো একমাত্র সম্ভব কোভিড-১৯ এর রোগীর চিকিৎসার সময় এবং তার সুস্থ হয়ে ওঠার সময় যদি নিশ্চিত করা যায় তাকে সঠিক পরিমাণ স্টেরয়েড দেওয়া হচ্ছে, সঠিক সময় ধরে।

তিনি বলেন, গত বছর তিনি ৮০০ জন ডায়াবেটিক কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা করেছেন এবং এদের কেউ কোভিড পরবর্তী ছত্রাক সংক্রমণের শিকার হননি। রোগী সুস্থ হবার পর বা হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর তার রক্তে শর্করার মাত্রা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রাখা খুবই জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।

ভারত সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, এই ছত্রাক সংক্রমণ যদিও সেভাবে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়নি, কিন্তু ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে মিউকোরমাইকোসিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কেন এভাবে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে তার কারণ এখনও সঠিকভাবে বোঝা যাচ্ছে না।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

অর্থসূচক/কেএসআর