বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার তহবিল ক্রমবর্ধমান চাপে থাকলেও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বহুবর্ষী মানবিক সহায়তা হিসেবে ২ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া।
সোমবার অস্ট্রেলিয়া সরকার এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এ সহায়তা ঘোষণা করে। ২০২৬-২০২৮ মেয়াদে অস্ট্রেলিয়ার মানবিক কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী সহায়তা ও সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় এ অর্থ ব্যয় করা হবে বলে ঢাকায় ইউএনএইচসিআরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
ঢাকায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব, কাস্টমস ও বহুসাংস্কৃতিক বিষয়ক এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক সহকারী মন্ত্রী জুলিয়ান হিলের উপস্থিতিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এ নমনীয় বহুবর্ষী অর্থায়নের মাধ্যমে ইউএনএইচসিআর ও এর অংশীদাররা রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে সুরক্ষা কার্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং দুর্যোগঝুঁকি হ্রাস উদ্যোগসহ অত্যাবশ্যকীয় সেবা অব্যাহত রাখতে পারবে। এসব কার্যক্রম বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাসরত রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত হবে।
জুলিয়ান হিল বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া আমাদের অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর প্রতিক্রিয়ায় ধারাবাহিকভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের অঞ্চলকে আরও নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সহনশীল করে তুলছে।’
তিনি মিয়ানমার ও বাংলাদেশ-উভয় দেশেই রোহিঙ্গাদের মানবিক প্রয়োজন পূরণে অস্ট্রেলিয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ভেতরে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান করা হবে।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জুলিয়েট মুরেকেয়িসোনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির প্রায় নয় বছর পর নতুন নতুন বৈশ্বিক সংকটের কারণে এ সংকট আন্তর্জাতিক মনোযোগের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার অব্যাহত সহায়তা একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় যে, রোহিঙ্গাদের বিশ্ব ভুলে যায়নি। রোহিঙ্গারা এখনো নিজ দেশে ফিরে যেতে চায়-তবে তা হতে হবে তাদের অধিকার, মর্যাদা ও নাগরিকত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল বলেন, সর্বশেষ এ সহায়তা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রোহিঙ্গাদের, বিশেষ করে নারী, কিশোরী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় সেবা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাদের অধিকাংশই ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে পালিয়ে এসে কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অর্থায়নের ঘাটতির কারণে মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে এবং অনেক রোহিঙ্গা বেঁচে থাকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ২০২৫ সালে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, অর্থসংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নারী, কিশোরী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধীদের ওপর। এছাড়া ২০২৪ সাল থেকে আনুমানিক দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা শিবিরে এসেছে, যাদের অনেকেই এখনো পর্যাপ্ত আশ্রয় ও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সম্প্রসারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গারা আরও সক্ষম ও আত্মনির্ভর হতে পারে।
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাদের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সংহতি ও সহযোগিতা অপরিহার্য।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.