নিজের কাজের মূল্যায়নে ৭০-৮০ দিলেন অর্থ উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনে দেড় বছরের অভিজ্ঞতায় নিজের কাজের মূল্যায়ন করেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। নিজেকে তিনি ১০০ নম্বরের মধ্যে ৭০ বা ৮০ দিয়েছেন। বলেছেন, অনেক উদ্যোগ শুরু করা হলেও শেষ করা সম্ভব হয়নি। তবে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছাড়াই জনগণের স্বার্থে কাজ করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনীতি পরিচালনা করা সহজ ছিল না। কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে। তিনি বলেন, নিজেকে ১০০ নম্বর দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। অনেক ইচ্ছা ছিল, অনেক কাজ শুরুও করা হয়েছে, কিন্তু শেষ করা যায়নি। তাই নিজেকে ৭০ বা ৮০-এর বেশি দিতে রাজি নন।

তিনি জানান, অনেক আগেই সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে নিজের কোনো আইনি জটিলতার আশঙ্কাও দেখছেন না। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সমালোচনা করা হোক, তবে পুরো চিত্রটি দেখা প্রয়োজন। ১৭-১৮ মাসে কিছুই করা হয়নি—এমন মন্তব্য সঠিক নয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এনবিআরকে কার্যকর করতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে, তবে নীতিগত সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে কর নীতিমালার একটি নির্দেশিকা রেখে যাচ্ছেন, যা পরবর্তী সরকারের জন্য সহায়ক হবে।

ব্যাংক খাত নিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারে গভর্নরের মর্যাদা বাড়ালেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। পরিচালনা সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা জরুরি। চার বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বড় কোনো সরকারি হস্তক্ষেপের মুখে পড়েননি বলেও জানান।

ব্যাংক খাতকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ, আস্থাহীনতা ও কম ঋণ বিতরণ অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। আমানত কিছুটা বাড়লেও পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ কম সৃষ্টি হওয়াকে অর্থনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

অর্থ পাচার বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কোন কোন দেশে এবং কারা অর্থ পাচার করেছে সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বলা কঠিন। বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া জটিল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতকেন্দ্রিক জটিলতা ও দীর্ঘদিনের সমস্যার কারণে সংস্কার কার্যক্রম ধীরগতির হয়েছে। তবে ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ইকুইটি ও বন্ড বাজারের উন্নয়ন অপরিহার্য।

নির্বাচিত সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, অর্থনীতিকে কার্যকর করতে ব্যবসা ও শিল্প খাত সচল করা জরুরি। দেশ এখনো সীমিত কয়েকটি রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প শক্তিশালী করাই বাস্তবসম্মত পথ বলে তিনি মত দেন।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনো বড় চাপ হিসেবে রয়ে গেছে, যা কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরবরাহব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত নীতির প্রয়োজন রয়েছে।

জ্বালানি খাত প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সৌর জ্বালানির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অফশোর ড্রিলিং এবং বিকল্প জ্বালানি উন্নয়নে আরও জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

আগামী সরকারের প্রতি তার পরামর্শ হলো চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং নতুন করে সবকিছু শুরু না করা। ভালো উদ্যোগগুলো ধরে রাখা, সমন্বয় বাড়ানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.