আইএমএফের শর্তে নতুন ঋণ নয়, বিকল্প অর্থায়ন খুঁজছে সরকার

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠিন শর্ত মেনে নতুন ঋণ নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার অর্থের ওপর নির্ভর করে দেশ পরিচালনার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার নতুন আর্থিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে আইএমএফের শর্তগুলো কী, কেন এসব শর্ত নিয়ে আপত্তি এবং দেশের অর্থনীতিতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আইএমএফের ঋণের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সরকারের আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এসব লক্ষ্য অর্জনে সংস্থাটি সরকারকে বিভিন্ন সংস্কারের পরামর্শ দেয়। ঋণ কর্মসূচির আওতায় কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের শর্তও থাকে।

আইএমএফের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো। এ জন্য করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আয়কর আদায় বাড়ানো এবং করছাড় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ায় রাজস্ব আদায় বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে দেখা হয়।

তবে করছাড় কমানো বা ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর ফলে কিছু পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে পারে। ব্যবসার খরচও বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, কর ফাঁকি বন্ধ এবং নতুন করদাতাদের করজালের আওতায় আনা গেলে সাধারণ করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়েও রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের দুর্বলতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসব সমস্যা মোকাবিলায় ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা যাচাই, খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেয় আইএমএফ।

এসব সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে সরকারি অর্থ ব্যবহার করা হলে শেষ পর্যন্ত এর বোঝা করদাতাদের ওপর পড়তে পারে। তাই ব্যাংক সংস্কারের খরচ কে বহন করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের বিনিময় হার আরও বাজারভিত্তিক করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপরও আইএমএফ গুরুত্ব দেয়। এর লক্ষ্য হলো ডলারের কৃত্রিম সংকট কমানো এবং বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্য তৈরি করা।

তবে টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানি ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে পড়তে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারে ভর্তুকি সরকারের বাজেটের বড় ব্যয়ের একটি খাত। ভর্তুকির চাপ কমানো এবং সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনার বিষয়টিও আইএমএফের সংস্কার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

ভর্তুকি কমালে সরকারের ব্যয় কমতে পারে। তবে বিদ্যুৎ বা সারের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের ওপর। তাই ভর্তুকি সংস্কারের ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং অপচয় কমানো জরুরি।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও আইএমএফের নীতিগত পরামর্শের অংশ। তবে সুদের হার বেশি থাকলে ব্যবসায় ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।

আইএমএফের ঋণ সাধারণত নির্দিষ্ট শর্ত ও নিয়মিত পর্যালোচনার আওতায় দেওয়া হয়। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে পরবর্তী কিস্তি ছাড় বা কর্মসূচির ধারাবাহিকতা প্রভাবিত হতে পারে। তবে সব শর্ত একই ধরনের নয়। কিছু শর্ত ঋণ ছাড়ের আগে পূরণ করতে হয়, আবার কিছু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হয়।

এ অবস্থায় আইএমএফের ঋণনির্ভরতা কমানোর সরকারি উদ্যোগের বাস্তবতা নির্ভর করবে বিকল্প অর্থায়নের উৎস, রাজস্ব আয় বাড়ানোর সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর। ঋণের শর্ত শিথিল করার চেষ্টা করা এক বিষয়, আর বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা করে ঋণনির্ভরতা কমানো আরেক বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাতের সুশাসন ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সংস্কার প্রয়োজন। তবে এসব সংস্কারের খরচ যেন সাধারণ মানুষ, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.