চীনের ওপর ব্যাটারি প্রযুক্তি ও কাঁচামালের নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রজন্মের ব্যাটারি সেল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে জেনারেল মোটরস। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাটারির সরবরাহব্যবস্থা যতটা সম্ভব দেশের অভ্যন্তরে গড়ে তুলতে চায় মার্কিন এই গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।
জেনারেল মোটরসের ব্যাটারি ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট কার্ট কেল্টি জানিয়েছেন, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে নতুন ব্যাটারি প্রযুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য দেশীয়ভাবে ব্যাটারি উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেবে প্রতিষ্ঠানটি।
বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য জিএম ইতোমধ্যে ডেনভারের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পিক এনার্জির সঙ্গে যৌথভাবে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সেল তৈরির কাজ শুরু করেছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা লিথিয়ামসহ বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অন্যতম সুবিধা হলো এতে যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলক সহজলভ্য সোডিয়াম ব্যবহার করা যায়। জিএমের দাবি, এই প্রযুক্তির ব্যাটারি বিস্তৃত তাপমাত্রায় কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা সম্ভব। বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যাটারি ঠান্ডা রাখতে সক্রিয় শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রয়োজনও কমতে পারে। ফলে উৎপাদন ও ব্যবহারের ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে।
পিক এনার্জির সঙ্গে যৌথভাবে ২০২৯ সালের দিকে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে জিএম। তবে তার আগ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারি উৎপাদন অব্যাহত থাকবে। এসব ব্যাটারির কিছু কাঁচামালের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা আপাতত থাকবে।
ব্যাটারি শিল্পে চীনের আধিপত্য
বিশ্বের ব্যাটারি সরবরাহব্যবস্থায় চীনের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিতে ব্যবহৃত ক্যাথোডের সক্রিয় উপাদানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং অ্যানোডের সক্রিয় উপাদানের ৯০ শতাংশের বেশি চীনে উৎপাদিত হয়। এর ফলে বৈশ্বিক ব্যাটারি উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশের ওপর দেশটির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
লিথিয়াম-আয়রন-ফসফেট ব্যাটারির কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদনেও চীনের বড় প্রভাব রয়েছে। জিএম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এলজি এনার্জি সলিউশনের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য এ ধরনের ব্যাটারি তৈরি করছে। অন্যদিকে ফোর্ড বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য চীনের সিএটিএলের প্রযুক্তি লাইসেন্স ব্যবহার করছে।
ফোর্ডের এই চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সম্পর্ক সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনার মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি ফোর্ডের চীনা অংশীদারত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে চীনের সিএটিএলের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেছেন।
এ পরিস্থিতিতে জিএম নিজেদের কৌশলকে ফোর্ডের পথ থেকে আলাদা রাখতে চাইছে। কেল্টির ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান চীনা প্রযুক্তির সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সরবরাহব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে নতুন ও উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করতে চায় জিএম।
সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা
ব্যাটারি বিশেষজ্ঞ ও টেলিমেট্রির বাজার গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্যাম আবুয়েলসামিদ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রে পুরো ব্যাটারি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক বছর সময় লাগবে। তবে সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তি তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল এবং সহজে উৎপাদন করা সম্ভব হওয়ায় এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
জিএমের কেল্টির মতে, চীনের বিদ্যমান ব্যাটারি প্রযুক্তি অনুকরণ করে বাজারে প্রতিযোগিতা করার চেয়ে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশটির বর্তমান অগ্রগতিকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা করাই বেশি কার্যকর। বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থার জন্য সোডিয়াম-আয়ন প্রযুক্তিকেই তিনি সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
এই প্রযুক্তি উন্নয়নে জিএম যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে তাদের প্রযুক্তি ও নকশা কেন্দ্রে ৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। এর আওতায় পাঁচ লাখ বর্গফুটের বেশি আয়তনের একটি ব্যাটারি সেল পরীক্ষামূলক উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। চলতি বছরের শেষ দিকে কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।
তবে চীনের আধিপত্য কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাটারি শিল্পে যে পরিমাণ বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার তুলনায় এই অর্থ এখনো সীমিত। তারপরও জিএমের পরিকল্পনা হলো নিজস্ব প্রযুক্তি ও দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারি খাতে চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা কমানো।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.