যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোতে বেতন বৈষম্য ৩১২ গুণ বেশি

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কর্মীদের বেতন ব্যবধান আরও বেড়েছে। ওই বছর সিইওরা গড়ে তাঁদের কোম্পানির মধ্যম সারির কর্মীর চেয়ে ৩১২ গুণ বেশি আয় করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর জোট এএফএল-সিআইওর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে টেসলার সিইও ইলন মাস্ক পারিশ্রমিক হিসেবে ১৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলার আয় করেছেন। টেসলার একজন গড় কর্মীর আয়ের তুলনায় তাঁর আয় ২৫ লাখ গুণ বেশি। একই বছর টেসলার মোট রাজস্ব ছিল ৯ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, অর্থাৎ মাস্কের পারিশ্রমিক কোম্পানিটির মোট রাজস্বের চেয়েও বেশি।

এএফএল-সিআইওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সিইওদের ক্ষেত্রে কর্মীদের সঙ্গে পারিশ্রমিকের ব্যবধান ছিল ২৮৫ গুণ। ২০২৫ সালে সেই ব্যবধান বেড়ে ৩১২ গুণে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অ্যামাজনের সিইও অ্যান্ডি জ্যাসি কোম্পানিটির একজন গড় কর্মীর চেয়ে ৫১ গুণ বেশি আয় করেছেন। ম্যাকডোনাল্ডসের সিইও ক্রিস কেম্পচিনস্কির আয় প্রতিষ্ঠানটির গড় কর্মীর চেয়ে ১ হাজার ৮২ গুণ বেশি।

শ্রমিক সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, বেতনবৈষম্য এতটা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সিইওরা নিজেদের পারিশ্রমিক বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিলে কোম্পানির স্থিতিশীলতা বা সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয়ে তাঁদের মনোযোগ কমে যেতে পারে।

এএফএল-সিআইওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিইওদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ছে। এর ফলে সিইওরা নিজেদের বেতন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এমনকি তাতে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও। অর্থাৎ ব্যক্তিগত মুনাফার বিষয়টি মুখ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

হিসাবের মধ্যে মাস্কের প্রভাব

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের সিইও হিসেবে পাওয়া পারিশ্রমিক অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। তবে ২০২৫ সালে মাস্ক বিপুল পারিশ্রমিক পেলেও টেসলার রাজস্ব ৩ শতাংশ কমেছে। গাড়ি বিক্রি কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে মাস্কের অংশগ্রহণের কারণে অনেক ভোক্তা টেসলা বর্জন করায় বিক্রি কমে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত বছর টেসলার ১১টি গাড়ির মডেল প্রত্যাহার করতে হয়েছে। মোট প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার গাড়ি বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। টেসলার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স, রকেট কোম্পানি স্পেসএক্সসহ আরও বিভিন্ন কোম্পানিতে মাস্কের বিনিয়োগ রয়েছে।

গত জুন মাসে শেয়ারবাজারে স্পেসএক্সের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ছাড়া হলে অল্প সময়ের জন্য ইলন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।

এএফএল-সিআইওর প্রতিবেদন অনুসারে, ইলন মাস্ককে অন্তর্ভুক্ত করে ২০২৫ সালে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকভুক্ত কোম্পানিগুলোর সিইওদের গড় বার্ষিক পারিশ্রমিক ১ হাজার ৭০০ শতাংশ বেড়ে ৩১০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।

তবে মাস্ককে বাদ দিলে চিত্রটি অনেকটাই বদলে যায়। ২০২৪ সালে সিইওদের বার্ষিক গড় পারিশ্রমিক ছিল প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ২০২৫ সালে তা ২১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ২৮ লাখ ডলারে। এক দশক আগে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কোম্পানির সিইওদের গড় পারিশ্রমিকের তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ।

শিল্পভেদে বেতন ব্যবধানেও বড় পার্থক্য

শিল্পভেদে সিইও ও কর্মীদের আয়ে বড় পার্থক্য রয়েছে। উৎপাদন খাতে এই ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। এ খাতের একজন সিইও গড়ে বার্ষিক ৬৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় করেছেন। বিপরীতে একজন কর্মীর গড় আয় ছিল ৯৩ হাজার ডলারের কিছু বেশি। অর্থাৎ তাঁদের আয়ের ব্যবধান ১১ হাজার শতাংশের বেশি।

এ খাতে টেসলায় থাকা বড় ব্যবধান সামগ্রিক বেতন ব্যবধানের অনুপাত বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবধান ছিল শিল্প, বিনোদন ও অবসর খাতে। এই খাতের সিইওদের বার্ষিক গড় আয় ২ কোটি ৪৬ লাখ ডলার, যেখানে মধ্যম সারির কর্মীর আয় প্রায় ২৫ হাজার ডলার। এএফএল-সিআইওর হিসাবে, সিইও ও কর্মীর পারিশ্রমিকের ব্যবধান ছিল ১ হাজার ৫৭ অনুপাত ১।

কফি চেইন স্টারবাকসেও বড় ধরনের বেতন ব্যবধান রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মীর গড় আয় ছিল ১৭ হাজার ২৭৯ ডলার।

অন্যদিকে স্টারবাকসের সিইও ব্রায়ান নিকল গত বছর ৩ কোটি ডলারের বেশি পারিশ্রমিক পেয়েছেন। স্টারবাকসের সিইও ও মধ্যম সারির কর্মীর আয়ের ব্যবধান ছিল ১ হাজার ৭৯৪ অনুপাত ১।

এএফএল-সিআইওর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অ্যামাজনের সিইও অ্যান্ডি জ্যাসি কোম্পানিটির একজন গড় কর্মীর চেয়ে ৫১ গুণ বেশি আয় করেছেন। ম্যাকডোনাল্ডসের সিইও ক্রিস কেম্পচিনস্কির আয় প্রতিষ্ঠানটির গড় কর্মীর চেয়ে ১ হাজার ৮২ গুণ বেশি।

ট্রাম্পের আয় বেড়েছে ২৫৪ শতাংশ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে যে আয় করেছেন, এএফএল-সিআইওর প্রতিবেদনে তা-ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ট্রাম্পের আয় আগের বছরের তুলনায় ২৫৪ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর তাঁর আয় হয়েছে প্রায় ২২০ কোটি ডলার।

এর বড় অংশ এসেছে ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল ও মিমে কয়েন বিক্রি থেকে।

এএফএল-সিআইওর হিসাবে, ২০২৫ সালে ট্রাম্পের আয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যম সারির কর্মীর আয়ের প্রায় ৪৩ হাজার ১৫৪ গুণ বেশি।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.