চীনের বৃহত্তম মেমোরি চিপ তৈরির কোম্পানি সিএক্সএমটির শেয়ারের দাম প্রথম দিনেই ৪৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জের প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানিগুলোর স্টার মার্কেটে লেনদেন হচ্ছে এই শেয়ারের।
শেয়ারের দাম এতটা বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিটির বাজার মূলধন বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৮৭৩ কোটি মার্কিন ডলারে উঠেছে। ফলে সিএক্সএমটি এখন চীনের মূল ভূখণ্ডের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দামি। খবর গণমাধ্যমের।
চীনের চিপ কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের এই আগ্রহের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর খাতে চীন ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।
ইউরোপ ও আমেরিকার শেয়ারবাজারের প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানিগুলোর অবস্থা তেমন একটা ভালো যাচ্ছে না। চলতি মাসে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বড় ধরনের বিক্রির চাপ দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যেই কোম্পানিটির এই নজরকাড়া অভিষেক হলো।
সিএক্সএমটি ডায়নামিক র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি (ড্রাম) চিপ উৎপাদন করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ডেটা সেন্টার, মুঠোফোন, ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রে এসব চিপ ব্যবহৃত হয়।
২০১৬ সালে চেয়ারম্যান ঝু ইমিংয়ের নেতৃত্বে এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনিই কোম্পানির চেয়ারম্যান। কোম্পানির প্রধান কার্যালয় পূর্ব চীনের আনহুই প্রদেশের হেফেই শহরে।
সিএক্সএমটি জানিয়েছে, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) থেকে পাওয়া অর্থের বেশির ভাগই মেমোরি চিপ উৎপাদন বাড়ানো এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যয় করা হবে।
সিএক্সএমটির আইপিওর এই সফলতা চীনের আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারকদের জন্যও স্বস্তির খবর। গত কয়েক সপ্তাহে চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতনে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বাজার মূলধন কমেছে। এই আইপিও বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর উদ্যোগ।
বর্তমানে বৈশ্বিক ড্রাম চিপের বাজারে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ইলেকট্রনিকস, এসকে হাইনিক্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রন প্রভাবশালী। এই তিন কোম্পানি মিলে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ ড্রাম চিপ উৎপাদন করে।
চলতি মাসের শুরুতে এসকে হাইনিক্স নিউইয়র্কে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ২ হাজার ৬৫০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় আইপিও এটি।
এআই চিপ কোম্পানি এনভিডিয়ার অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হচ্ছে এই সিএক্সএমটি। তারা জানিয়েছে, ১৭ কোটি ৭৯ লাখ আমেরিকান ডিপোজিটারি শেয়ার প্রতিটি ১৪৯ মার্কিন ডলার দরে বিক্রি হয়েছে।
নাসডাকে লেনদেনের প্রথম দিন শুক্রবার এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম একপর্যায়ে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। তবে পরে দাম কিছুটা কমে যায়।
এআই চিপের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকায় গত মে মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে এসকে হাইনিক্সের বাজারমূল্য ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়।
চিপের বাজারে প্রতিযোগিতা
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বহু যুদ্ধ, কূটনৈতিক সংঘাত ও বিভিন্ন দেশের জোট গড়ে ওঠার পেছনে অন্যতম চালিকা শক্তি ছিল তেল। তবে এখন বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আরেকটি কৌশলগত সম্পদ। সেটা হলো, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ।
স্মার্টফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার, গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার—প্রায় সব আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণশক্তি হলো এই চিপ। আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশাল। বর্তমানে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের মূল্য ৫০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে এ বাজারের আকার প্রায় দ্বিগুণ হবে। খবর গণমাধ্যমের।
চিপ তৈরির পেছনে কাজ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা জটিল সরবরাহব্যবস্থা। কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, নকশা, উৎপাদন ও সংযোজন—প্রতিটি ধাপেই যুক্ত থাকে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও দেশ।
এই শিল্পের সরবরাহব্যবস্থা জটিল ও পরস্পর নির্ভরশীল। ফলে পুরো শৃঙ্খলের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের বড় অংশ তার হাতেই থাকবে। সহজ কথায়, সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণই আগামী দিনের বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার অন্যতম চাবিকাঠি।
বর্তমানে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। কিন্তু চীনও দ্রুত নিজস্ব চিপ প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে। সেখানেই শুরু হয়েছে দুই পরাশক্তির সংঘাত। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য, অত্যাধুনিক চিপ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে বেইজিংয়ের প্রবেশ যতটা সম্ভব সীমিত রাখা।
সে কারণে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এখন শুধু বাণিজ্যের নয়; বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.