মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দায়ের করা এক মামলায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর আলোচিত ব্যক্তি হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রোববার (১২ জুলাই) রাতে গাইবান্ধা জেলা পুলিশের সহযোগিতায় পলাশবাড়ীর রাম মন্দির এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে গাইবান্ধার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. জসিম উদ্দীন গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের হওয়া মানি লন্ডারিং মামলায় হরিদাস চন্দ্রকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে তার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব লেনদেনের মধ্যে নগদ অর্থের পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, গত ২ জুলাই থেকে সিআইডি তার অর্থের উৎস ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। তদন্তে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পর রোববার তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরে রাতেই তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়েছে।
সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে ২০১০ সালে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর দেশে ফেরেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তৌহিদ ইসলাম নাম ধারণ করেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়া, বদলি, হুন্ডি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তার বৈধ আয়ের উৎস না থাকলেও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের হিসাবে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে এবং প্রায় একই পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এসব লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে একাধিক ব্যক্তি তার ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করেছেন, যা তার ঘোষিত পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সিআইডি জানিয়েছে, বনানী থানায় তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই একটি মামলা রয়েছে। ওই মামলায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং দণ্ডবিধির প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও ক্ষমতার অপব্যবহারসংক্রান্ত একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়েছে। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে।
এর আগে ২০২২ সালের ৮ নভেম্বর র্যাবের যৌথ অভিযানে ঢাকার বনানী এলাকা থেকে সহযোগীসহ আটক হয়েছিলেন হরিদাস চন্দ্র। সে সময় তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পলাশবাড়ীর মধ্য রামচন্দ্রপুরে প্রায় দুই একর জমির ওপর শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দিরের আধুনিকায়ন শুরু করেন তিনি। সেখানে ২৮ ফুট উচ্চতার শিবমূর্তি, ৫৩ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে এবং ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণাধীন রয়েছে। এছাড়া ২০১৯ সালে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি কিনে রিসোর্ট নির্মাণের তথ্যও পেয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি তার আয়ের উৎস তদন্ত এবং গ্রেপ্তারের দাবিতে গাইবান্ধায় সচেতন নাগরিক ফোরামের ব্যানারে একাধিক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ রোববার পলাশবাড়ী উপজেলা চৌরাস্তায় এ দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.