একই বাজেট, দুই বাস্তবতা: বাড়তি করের চাপে করদাতা!

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। দেশের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৭৬ শতাংশই আসে এ খাত থেকে। তৈরি পোশাক শিল্প, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, ওষুধশিল্প, নির্মাণ, পরিবহন ও সেবাখাত—সব ক্ষেত্রেই বেসরকারি উদ্যোক্তা ও কর্মীদের অবদান অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ের মাধ্যমে এই খাতই দেশের প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

দেশের মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশও বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। লাখ লাখ বেসরকারি চাকরিজীবী তাঁদের শ্রম, মেধা ও কর প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন।

কিন্তু প্রস্তাবিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করমুক্ত আয়ের সীমা ২৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হলেও বাস্তবে মধ্যম আয়ের বেতনভোগীদের করের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। যে বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেই একই বাজেটে বেসরকারি চাকরিজীবীদের ওপর করের চাপও বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে সরকারি কর্মচারীরা অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বহন করতে হবে বাড়তি করের বোঝা।

প্রশ্ন হলো, একই অর্থনীতিতে দুই ধরনের কর্মজীবী মানুষের জন্য এমন বৈপরীত্যপূর্ণ নীতি কতটা ন্যায্য?

বিনিয়োগজনিত কর-রেয়াত বিবেচনার পর একজন বেতনভোগী করদাতার করের চিত্র নিম্নরূপ:

মাসিক বেতন (টাকা) বার্ষিক কর (করবর্ষ ২০২৫–২৬) বার্ষিক কর (করবর্ষ ২০২৬–২৭) কর বৃদ্ধি (টাকা) কর বৃদ্ধির হার
৭৫,০০০ ৫,৫০০ ৮,০০০ ২,৫০০ ৪৫.৪৫%
১,০০,০০০ ২১,৫০০ ৩২,৭৫০ ১১,২৫০ ৫২.৩৩%
২,০০,০০০ ২,১৯,৫০০ ২,৫৮,২৫০ ৩৮,৭৫০ ১৭.৬৫%
৩,০০,০০০ ৫,০৫,০০০ ৫,৪৫,০০০ ৪০,০০০ ৭.৯২%

এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। সর্বোচ্চ আয়ের করদাতাদের তুলনায় মধ্যম আয়ের বেতনভোগীরাই তুলনামূলকভাবে বেশি হারে কর বৃদ্ধির শিকার হচ্ছেন। মাসিক এক লাখ টাকা আয়কারী একজন কর্মীর করের বোঝা ৫২ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

কর বৃদ্ধির এই পরিস্থিতি কেবল করমুক্ত আয়ের সীমা পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন।

প্রথমত, পূর্ববর্তী কর কাঠামোতে করমুক্ত আয়ের সীমার পরবর্তী এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর মাত্র ৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হতো। নতুন বাজেটে সেই ৫ শতাংশের স্ল্যাব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে। ফলে করদাতারা সর্বনিম্ন করহারের সুবিধা হারিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ করহারের আওতাধীন আয়ের পরিসর সংকুচিত করা হয়েছে। এর ফলে করযোগ্য আয়ের একটি বড় অংশ দ্রুত উচ্চতর করহারের আওতায় চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ করদাতাদের আয়ের বড় অংশ এখন আগের তুলনায় বেশি হারে করের আওতায় পড়ছে।

তৃতীয়ত, বিনিয়োগজনিত কর-রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। জীবনবিমা, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগের মাধ্যমে যে কর-সুবিধা পাওয়া যেত, তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

সব মিলিয়ে এই তিনটি পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে করদাতাদের কর দায় বেড়েছে। একই সঙ্গে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের উৎসাহও কমেছে।

বর্তমান বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই চাপে রয়েছে। অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা প্রকৃত আয় বৃদ্ধির পরিবর্তে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করছে।

এ অবস্থায় করের অতিরিক্ত বোঝা আরোপ করা হলে সঞ্চয় কমে যাবে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং ভোগব্যয়ও সংকুচিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক হবে না।

আমরা বিশ্বাস করি, রাজস্ব আহরণ রাষ্ট্রের জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু রাজস্ব নীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ন্যায্যতা, সাম্য এবং করদাতার সক্ষমতা। যারা দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের মূল শক্তি, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

তাই সরকারের প্রতি বিনীত আহ্বান—

১. ৫ শতাংশ কর স্ল্যাব পুনর্বহাল করা হোক।
২. ১০ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ কর স্ল্যাবের পরিসর পুনর্বিবেচনা করা হোক।
৩. বিনিয়োগজনিত কর-রেয়াতের হার পুনরায় ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হোক।
৪. মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হোক।
৫. বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিশেষ স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন বা কর-ছাড়ের ব্যবস্থা চালু করা হোক।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় বেসরকারি খাতের অবদান অনস্বীকার্য। তাই বাজেটের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীদের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত করের বোঝা পুনর্বিবেচনা করা সময়ের দাবি। রাজস্ব আহরণ যেমন জরুরি, তেমনি করদাতার প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় সমাজে এমন একটি বার্তা প্রতিষ্ঠিত হবে যে, “যারা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে, তারাই সবচেয়ে বেশি শাস্তি পাচ্ছে”—যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. আল-আমিন ভূঞা

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.