বাজেটে এডিপি বরাদ্দ উচ্চাভিলাষী, বাস্তবায়ন নিয়ে বড় প্রশ্ন: সিপিডি

২০২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ঘোষণা করেছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন বাজেট। এডিপির আকার জিডিপির ৪.৪ শতাংশ, যেখানে ২০২৬ অর্থবছরে তা ছিল ৩.৭ শতাংশ এবং সংশোধিত হিসাবে ৩.৩ শতাংশ।

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এসব তথ্য তুলে ধরেন।

তবে উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। কারণ ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৩৫.৪ শতাংশ। এমন প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরে এডিপির আকার আগের বছরের তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বা ৩০.৪ শতাংশ বৃদ্ধি করাকে উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে সিপিডি।

সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরের এডিপির ৩৬.৭ শতাংশ অর্থায়ন হবে প্রকল্প সহায়তা (বিদেশি ঋণ ও অনুদান) থেকে, যা ২০২৬ অর্থবছরে ছিল ৩৭.৪ শতাংশ।

মোট প্রকল্প সহায়তার প্রায় ১৯.১ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র দুটি বড় প্রকল্পের জন্য। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে মোট প্রকল্প সহায়তার ১৩.৪ শতাংশ এবং ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ প্রকল্পে ৫.৮ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে বড় মেগা প্রকল্পগুলোর ওপর বিদেশি অর্থায়নের নির্ভরতা এখনও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়ে গেছে।

এডিপির অতিরিক্ত ৭০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের সবচেয়ে বড় অংশ পেয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ২১ হাজার ৩৪ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ১৭ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। মোট অতিরিক্ত বরাদ্দের মধ্যে শিক্ষা খাতের অংশ ৩০.০৫ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতের অংশ ২৪.৮৩ শতাংশ।

সিপিডির মতে, মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা না গেলে এই বাড়তি বরাদ্দের কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন কঠিন হবে।

বরাদ্দ কমানো হলেও পরিবহন ও যোগাযোগ খাত এখনও এডিপির সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাত হিসেবে রয়েছে। এই খাতে মোট এডিপির ১৬.৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে এবং প্রকল্প সংখ্যা ১৭৮টি। অন্যদিকে শিক্ষা খাত মোট এডিপির ১৬.৫ শতাংশ বরাদ্দ পেয়েছে, যা গত অর্থবছরের ১২.৪ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

পরিবহন ও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং আবাসন ও কমিউনিটি সুবিধা- এই পাঁচটি খাত মিলেই মোট এডিপি বরাদ্দের ৬২.৮ শতাংশ পেয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি যখন জাতীয় অগ্রাধিকারের অন্যতম, তখন কৃষি খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়াকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে সিপিডি।

২০২৬ অর্থবছরে এডিপিতে কৃষি খাতের অংশ ছিল ৪.৭ শতাংশ, যা ২০২৭ অর্থবছরে কমে ৩.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

সিপিডির মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের ঝুঁকির মধ্যে কৃষি খাতে বিনিয়োগ হ্রাস দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

২০২৭ অর্থবছরের এডিপিতে মোট ১ হাজার ১০৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ১ হাজার ৮৫টি প্রকল্পের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে ৭০টি নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নতুন প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মোট এডিপির ১.৮ শতাংশ। অন্যদিকে চলমান প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ কমে ২৪.৪ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও নতুন প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, তবে চলমান প্রকল্প দ্রুত শেষ করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মনে করছে সিপিডি।

এডিপি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩৭৭টি প্রকল্প নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করেছে, যা মোট বরাদ্দের ১০.৯ শতাংশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সবচেয়ে বেশি বিলম্বিত প্রকল্প রয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে (৮০টি), আবাসন ও কমিউনিটি সুবিধা খাতে (৫৭টি), শিক্ষা খাতে (৪৫টি) এবং পরিবেশ ও জলসম্পদ খাতে (৩৫টি)।

সিপিডির মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হচ্ছে।

সরকারি হিসাবে ২০২৭ অর্থবছরে ৪০৩টি প্রকল্প সমাপ্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বকেয়া প্রকল্পসহ মোট ৭৮০টি প্রকল্প ওই সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরিকল্পনা কমিশন বাস্তবে মাত্র ২৩১টি প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপর্যাপ্ত বরাদ্দ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করা কঠিন হবে।

সিপিডির মূল্যায়নে, ২০২৭ অর্থবছরের এডিপি আকারে বড় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ইতিবাচক অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা, কৃষি খাতে বরাদ্দ হ্রাস, মেগা প্রকল্পে অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বিপুল সংখ্যক বিলম্বিত প্রকল্প সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সিপিডির অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই আগামী অর্থবছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে।

 

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.