উদ্যোক্তা তৈরি করতে হলে শেয়ারবাজারকে পুঁজির শক্তিশালী উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে: তথ্যমন্ত্রী

দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে হলে ব্যাংকের ওপর চাপ কমিয়ে শেয়ারবাজারকে পুঁজির শক্তিশালী উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।

শেয়ারবাজার ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা অনেক বেশি। যারা ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা টার্গেট করে, তারাই আবার শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে হলে ব্যাংকের ওপর চাপ কমিয়ে শেয়ারবাজারকে পুঁজির শক্তিশালী উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

রোববার (৭ জুন) রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতে সুশাসন ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সামনে এনে গণমাধ্যম জনমত গঠনে সহায়তা করেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও শৃঙ্খলাপূর্ণ করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। অতীতে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাই বস্তুনিষ্ঠ ও যাচাইভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

গণমাধ্যমকে আয়নার সঙ্গে তুলনা করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা আয়না দিয়ে খেলতাম। ভালো কোয়ালিটির আয়নায় আসল চেহারা দেখা যায়, আর যেটার কোয়ালিটি ভালো না, সেখানে নিজের চেহারাই বাঁকা দেখা যায়। এমনকি শাহরুখ খানের মতো জনপ্রিয় নায়কের চেহারাও খারাপ আয়নায় অদ্ভুত দেখাতে পারে। গণমাধ্যম হচ্ছে সেই আয়না। কোনো রাষ্ট্র বা সমাজ নিজেদের চেহারা জনগণের সামনে কতটা স্বচ্ছভাবে প্রতিফলিত করতে চায়, তা নির্ভর করে তারা এই আয়নাকে কতটা গ্রহণ করছে তার ওপর।’

মন্ত্রী জানান, ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কার আনতে সরকার একটি কমিশন গঠনের পরিকল্পনা করছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পর্যায়ে সুশাসন নিশ্চিত না হলে শুধু ব্যাংক খাত বা গণমাধ্যমের একক প্রচেষ্টায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, কোনো তথ্য প্রকাশের আগে তার পেছনে রাষ্ট্রীয় নীতি বা প্রভাব রয়েছে কি না- তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।

পরিসংখ্যান ম্যানিপুলেশন বা কারসাজির কঠোর সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায় নির্দেশ জারির পর খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হিসাব রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে গেছে। রাষ্ট্র যখন তার কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক রেটোরিক দেওয়ার জন্য পরিসংখ্যান ব্যুরোকে ব্যবহার করে, তখন তারা কতটা ম্যানিপুলেশন করতে পারে তা ভাবার বিষয়। আমার এখন ঘুমের দরকার, তাই বলতে হবে সূর্য ওঠেনি; আমার এখন অপরাধ করতে হবে, তাই দিনের বেলাকে বলতে হবে এখন রাত্রি; এভাবে ম্যানিপুলেশন করার ক্ষমতা যদি রাষ্ট্রের থাকে, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সব জায়গায় প্রভাব ফেলবে।’

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণমাধ্যম সমাজের বাস্তবতার প্রতিফলন। তবে সেই প্রতিফলন যদি বিকৃত হয়, তাহলে তা জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এজন্য গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ ভূমিকা রাখতে হবে।

ব্যাংকিং কমিশন গঠন ও উদ্যোক্তাদের বিষয়ে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘আমাদের দেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর থেকে এখন অনেক বিস্তৃত হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের মতো অর্থনীতিতে রক্তপ্রবাহের উৎসকে সংস্কার করতেই হবে। ব্যাংক থেকে মূলধন নিয়ে উদ্যোক্তারা কাজে লাগান। কিন্তু তাদের মধ্যে কারা সত্যিকারের পারফর্মার আর কারা চোর, বাটপার, গুন্ডা, বদমাশ, তা পরিসংখ্যানই বলে দেয়।’

সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠতার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা ও ক্ষমতার একমাত্র মানদণ্ড হলো বস্তুনিষ্ঠতা। বস্তুনিষ্ঠতা ছাড়া গণমাধ্যম কর্তৃত্বপরায়ণ হতে পারে না। সাংবাদিকদের বসার জায়গা ফার্স্ট ফ্লোরে নাকি থার্ড ফ্লোরে সেটা বড় কথা নয়, সবচেয়ে বড় কথা হলো ‘অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন’ বা তথ্যের কাছে তাদের যাওয়ার সুযোগ আছে কি না। ব্যাংক যেখানে তথ্য রাখে, সেখানে সাংবাদিকদের পৌঁছানোর সুযোগ বা গ্রাউন্ড ফ্লোর পর্যন্ত তাদের যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে।’

সেমিনারে অন্যান্য বক্তারা বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যেসব ব্যাংক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানদণ্ড বজায় রাখতে পেরেছে, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে বলেও তারা মত দেন।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.