ঈদুল আজহার ত্যাগের মহিমায় দরিদ্রদের ঘরে আনন্দ পৌঁছে দিল ‘সবার পাশে আমরা ফাউন্ডেশন’

ঈদুল আজহা মুসলমানদের জীবনে শুধু একটি উৎসব নয়, বরং ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর প্রতি নিখাদ সমর্পণের প্রতীক। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগের স্মরণে পালিত এই পবিত্র উৎসবে সামর্থ্যবান মুসলিমরা পশু কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেন এবং সেই গোস্ত সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করেন।

এই চেতনাকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে ‘সবার পাশে আমরা ফাউন্ডেশন’। প্রতি বছরের মতো এবারও সংগঠনটি একটি গরু কোরবানি করে প্রায় ৯৮টি দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে গোস্ত বিতরণ করেছে।

পরিবারের সদস্য সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত নিয়মে গোস্ত বিতরণ করা হয়। যেসব পরিবারে ১ থেকে ৪ জন সদস্য রয়েছে তারা পেয়েছেন ১ কেজি গোস্ত এবং ৫ থেকে ৮ জন সদস্যের পরিবারগুলো পেয়েছেন ২ কেজি করে। সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল ঈদের আনন্দ থেকে যেন কোনো পরিবার বঞ্চিত না হয়।

ফাউন্ডেশনের প্রধান উদ্যোক্তা মুহাম্মদ আবুল বাহার ফারাহ্ বলেন, “আমরা এমন পরিবারগুলোকে বেছে নিই যারা লজ্জা ও আত্মসম্মানের কারণে কারও কাছে সাহায্য চাইতে পারেন না। ঈদের দিনে তাদেরও গোস্ত খাওয়ার ইচ্ছা থাকে। আমরা সেই ছোট্ট চাওয়াটা পূরণ করতে চাই।”

আরেক উদ্যোক্তা মুহাম্মদ তৌকির আহম্মদ জানান, সারা বছর ধরে তারা নীরবে এমন পরিবারের তালিকা তৈরি করেন যাদের বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন হয়, কিন্তু তারা কাউকে বলতে পারেন না। সেই তালিকার ভিত্তিতেই প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়।

ফাউন্ডেশনের অন্যতম উদ্যোক্তা মোহাম্মদ শফিকুল আশরাফ তুহিন বলেন, “কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো ত্যাগ ও মানবতার চর্চা। আমরা কয়েক বছর ধরে দরিদ্র পরিবারগুলোর ঘরে গোস্ত পৌঁছে দিয়ে সেই আনন্দ ভাগাভাগি করছি। তাদের মুখের হাসিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”

তিনি আরও বলেন, “অনেক পরিবার সম্মানের কারণে প্রকাশ্যে সাহায্য নিতে চান না। তাই আমরা গোপনীয়তা বজায় রেখে তাদের বাসায় গোস্ত পৌঁছে দিই, যাতে তাদের আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।”

‘সবার পাশে আমরা ফাউন্ডেশন’ ২০০৮ সালে কয়েকজন তরুণ-তরুণীর উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে। বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের স্বেচ্ছা অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত এই সংগঠনটি গত ১৮ বছর ধরে বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

প্রতি বছর ঈদুল ফিতরে দরিদ্র পরিবারগুলোর মাঝে ঈদের বাজার বিতরণের পাশাপাশি ২০১৭ সাল থেকে ঈদুল আজহায় কোরবানির গোস্ত বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি।

বর্তমানে ফাউন্ডেশনের প্রধান উদ্যোক্তাদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ তুহিন, মো. আবুল বাহার ফারাহ্, মুহাম্মদ তৌকির আহম্মদ, কাউসার আহম্মদ হুমায়ুন, মেহেদী হাসান লিয়ন, শামীমা আক্তার নিম্মি এবং প্রয়াত আফরার মেহেজাবিন খান রাথী।

কেবল কোরবানির গোস্ত বিতরণ নয়, সারা বছর দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ প্রদান, অসুস্থদের চিকিৎসা সহায়তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তাসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি।

একজন উপকারভোগী মা বলেন, “বহু বছর ঈদ এসেছে, কিন্তু আমাদের ঘরে গোস্ত রান্না হয়নি। এবার ফাউন্ডেশনের ভাই-বোনেরা গোপনে গোস্ত দিয়ে গেছে। আমার সন্তানরা খুব খুশি হয়েছে। আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন।”

ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারবেন তারা। তাদের এই উদ্যোগ সমাজে মানবিকতা ও সহমর্মিতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.