প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে এলসি জালিয়াতিসহ বিপুল অঙ্কের ভুয়া ঋণ সৃষ্টির অভিযোগ

প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি নারায়ণগঞ্জ শাখার বিরুদ্ধে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি জালিয়াতি, অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসহ গ্রাহকদের নামে বিপুল অঙ্কের ভুয়া ঋণ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের কারণে ২৬টি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা সংকটে রয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।

শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ডয়েস ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি’র নারায়ণগঞ্জ শাখার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে ব্যবসা পরিচালনা করলেও ২০১৭ সাল থেকে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে জাল সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি করেন ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা। এসব কৃত্রিম কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়, যেখানে বাস্তবে কোনো কাঁচামাল সরবরাহ হয়নি। পরে ওই এলসির বিপরীতে তৈরি দায় চলতি হিসাবের মাধ্যমে নিষ্পত্তি দেখিয়ে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার থেকে ডলার কেনা হয়।

ভুক্তভোগীদের দাবি, বাজারদরের চেয়ে ১২ থেকে ১৫ টাকা অতিরিক্ত দরে ডলার কেনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। এছাড়া রপ্তানি নথির বিপরীতে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ চলতি হিসাবে জমা দিয়ে পরে সেই অর্থ ব্যবহার করে ডলার ক্রয় ও কথিত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির দায় পরিশোধ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক একতরফাভাবে ফোর্সড লোন ও ডিমান্ড লোন তৈরি করে বিপুল সুদ আরোপ করেছে—যা গ্রাহকদের কোনো নোটিশ ছাড়াই করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন লঙ্ঘন করে চলতি হিসাব, নগদ জমা ও ঋণ সৃষ্টি করে এলসি সমন্বয় করা হয়েছে। তবে বারবার পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাওয়া হলেও ব্যাংক তা দেয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে ফাঁকা চেক ব্যবহার করে অর্থঋণ আদালতে মামলা করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, পুনঃতফসিলের শর্তে স্বাক্ষর না করলে এলসিসহ অন্যান্য ঋণ সুবিধা বাতিলের হুমকি দেওয়া হতো। এতে কারখানার কার্যক্রম ও শ্রমিকদের বেতন ঝুঁকির মুখে পড়ে। এতে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হয়ে কারখানা বন্ধের ঝুঁকি ছিল এবং স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হতো। পরে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে পুনঃতফসিলে রাজি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা বাতিল করে দেয়। ফলে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, ব্যাংকের চাপ ও ঋণজনিত মানসিক উদ্বেগে দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারা গেছেন। এর মধ্যে টোটাল ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসিবউদ্দিন মিয়াকে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর একদিনে ৩৭ বার ফোন করে স্বাক্ষরের জন্য চাপ দেওয়া হয়। এমন অস্বাভাবিক ও অসহনীয় মানসিক চাপের কারণে একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এছাড়া ওয়েস্ট অ্যাপারেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকে মিথ্যা অভিযোগের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপে ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অনবরত চাপ ও ঋণসংকটে স্ট্রোকে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়েছেন আরও একটি প্রতিষ্ঠানের এমডি।

ব্যাংকের আরোপিত ঋণের পরিমাণ প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করে ভুক্তভোগী ২৬টি প্রতিষ্ঠান। তাদের মতে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোনো বড় অস্বাভাবিক দায় না থাকলেও ২০২৪ সালে হঠাৎ বিপুল অঙ্কের ঋণ দেখানো হয়, যা তারা অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বলে উল্লেখ করেন।

ব্যবসায়ীরা বলেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। এতে টাকা পরিশোধের সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এছাড়া কর্মসংস্থান হারাবে কিছু শ্রমিক-কর্মচারী এবং কমে যাবে দেশের রপ্তানি। ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখলেই টাকা পরিশোধ করা সম্ভব। তাই তারা ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে রেখে প্রকৃত দায় পরিশোধে আগ্রহী। এতে প্রতিষ্ঠানটিও বাঁচবে এবং প্রায় পঁচিশ হাজার শ্রমিকও কর্মহীন হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং স্বনামধন্য অডিট ফার্মের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে গত ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিত আবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টোটাল ফ্যাশন লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহরাব বিন হাসিব, জননী ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গৌতম পোদ্দার প্রমুখ।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.