ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাণিজ্য নির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা সভা গত শনিবার ( ৯ মে) ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম)-এর মহাপরিচালক মোঃ সলিম উল্লাহ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআইর ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী বলেন, দেশের লজিস্টিকস খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা রপ্তানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, বন্দরগুলোতে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতা, সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহনে ধীরগতি এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যয়বহুল ও মন্থর হয়ে পড়ছে।
রোববার (১০ মে) সংস্থাটি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বন্দরগুলোতে পেপারলেস অটোমেটেড ব্যবস্থা চালু, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য একটি দক্ষ ও টেকসই লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিআইএম-এর মহাপরিচালক মোঃ সলিম উল্লাহ বলেন, সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এতে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জিডিপিতে উৎপাদনমুখী খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে এ খাতের আরও প্রবৃদ্ধির জন্য স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, গত চার দশকে বাংলাদেশের রপ্তানিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও তা এখনো গুটিকয়েক পণ্য ও বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থনীতিতে বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত সংস্কার জরুরি।
ড. মাসরুর রিয়াজ জানান, দেশের বিদ্যমান লজিস্টিকস ব্যয় ২৫ শতাংশ কমানো গেলে রপ্তানি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এছাড়া পণ্য পরিবহন ব্যয় ১ শতাংশ কমানো সম্ভব হলে রপ্তানি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, লজিস্টিকস খাতের উন্নয়নে জাতীয় লজিস্টিক নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, বন্দর পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি কোম্পানির পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারিখাতের অংশগ্রহণ এবং চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাসের সময় কমানো জরুরি।
আলোচনা সভায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মোঃ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ শামসুল হক, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফেসিলিটেশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মনিরুজ্জামান, শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবী বক্তব্য দেন।
মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত। তাই রেলপথই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প। বন্দরের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপন করা গেলে কম সময় ও ব্যয়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।
ড. মোঃ শামসুল হক বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবভিত্তিক না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। যোগাযোগ অবকাঠামোকে সমন্বিত না করতে পারলে পিছিয়ে পড়তে হবে। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কারেরও প্রয়োজন রয়েছে।
এস কে মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, পানগাঁও বন্দরে স্ক্যানার মেশিন না থাকায় উদ্যোক্তারা বন্দরটি ব্যবহারে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এছাড়া অভ্যন্তরীণ নৌপথের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে শিল্পখাতে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট নুসরাত নাহিদ বাবী বলেন, দেশের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি সহজ ও আধুনিক হয়নি। বিশেষ করে স্থলবন্দরগুলোতে ডিজিটাল কার্যক্রম চালু না হওয়ায় পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হচ্ছে।
এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, ধীরাশ্রম আইসিডি কনটেইনার ডিপো এবং একটি মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব বাস্তবায়নে এডিবি কাজ করছে। একইসঙ্গে লজিস্টিকস সেবার প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআই পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এম এ ওয়াহাব, সাবেক পরিচালক এ কে ডি খায়ের মোহাম্মদ খান, ইএসজি প্রজেক্ট লজিস্টিকস (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আবরারুল আলম এবং এএনবি লজিস্টিকসের প্রতিনিধি মোক্তার উদ্দিন মতি অংশ নেন।
এ সময় ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মোঃ সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.