জ্বালানি সংকটে উৎপাদন অর্ধেকে, ব্যয় বেড়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ

লোডশেডিং ও জ্বালানি অনিশ্চয়তার ফলে দেশের কলকারখানাগুলোয় উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকেরও কম বা ৪০-৪৫ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে জ্বালানি ও পরিবহনের বাড়তি খরচের কারণে কস্ট অব ডুইং বিজনেস বা উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ। এ বহুমুখী সংকটে দেশের বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান এখন চরম ঝুঁকির মুখে।

গতকাল শনিবার (২ মে) গবেষণা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি?’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ডক্টর হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা। তারা বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের গভীরতা এবং সম্ভাব্য সমাধানের দিকগুলো নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর এ সাত্তার মণ্ডল জানান, কৃষির মাসল পাওয়ার বর্তমানে মেশিন পাওয়ার দিয়ে রিপ্লেস হয়েছে। বর্তমানে কৃষি খাতে প্রায় ৪২ লাখ ডিজেল ইঞ্জিন পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বাড়লে ডিজেলের চাহিদা আরো বাড়বে। জ্বালানির এ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে শুধু উৎপাদন ব্যয়ই বাড়বে না, বরং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, ‘এনার্জি হচ্ছে ইঞ্জিন অব ইকোনমি। এনার্জি ছাড়া শিল্প ও সেবা খাতে সামনের দিকে এগোনো খুব কঠিন। জ্বালানি সংকটের কারণে ইন্ডাস্ট্রিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন হচ্ছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, এতে উৎপাদন বাড়ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেসে কস্ট অব প্রডাকশন বেড়ে গেছে ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। উৎপাদন কমে গেছে ৪০-৪৫ শতাংশ। আমি মনে করি, এনার্জি সেক্টরকে সিকিউরড করার জন্য শর্ট-মিড-লং টার্ম পলিসি নিতে হবে। দ্রুত আমাদের কোল (কয়লাভিত্তিক) বেজ প্লান্টগুলোকে সক্ষমতার ভিত্তিতে চালানো উচিত। আদানি ও ভারত থেকে যতটুকু আসে সেগুলো দিয়েও আমাদের ডোমেস্টিক সক্ষমতা ধরে রাখা উচিত। গ্যাসগুলো দিয়ে আমাদের ফার্টিলাইজার থেকে শুরু করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল যাদের সক্ষমতা থাকে সেগুলো আমাদের দেখা উচিত।’

সাবেক জ্বালানি সচিব একেএম জাফর উল্লাহ খান সংকটের মূল কারণ নির্দেশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমাদের মজুদক্ষমতা কী পরিমাণ আছে, কতদিনের জন্য আমরা মজুদ রাখতে পারি এ প্রশ্নটা উঠেছে। জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে আজ হোক বা কাল হোক বাড়াতেই হবে এবং এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। কিন্তু দাম বাড়ুক বা কমুক আমাদের দরকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। স্টোরেজ ক্যাপাসিটি সীমিত হলে বড় ধরনের শক সামাল দেয়া কঠিন।’

ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের (টিএসআই) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও দেশের আমদানি ব্যয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করে। তাই বিকল্প উৎসের চিন্তা করতে হবে। আমাদের একমাত্র উৎস আগে মিডল ইস্টে (মধ্যপ্রাচ্যে) ছিল। কিন্তু এখন অন্য জায়গাতেও সেই সোর্সিংটা বাড়ানো যায় কিনা খুঁজে বের করতে হবে।’

বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক অভিযোগ করেন, জ্বালানির চলমান সংকটকালে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা করেনি।

সংকট সমাধান নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসগুলো কাজে লাগাতে হবে।’

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.