যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বেসামরিক প্রধান জন ফেলানকে গতকাল বুধবার তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানে—এমন ছয়টি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, জাহাজ নির্মাণ সংস্কার বাস্তবায়ন এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ তাঁর ওপর বেশ চটেছেন। এ নিয়ে উত্তেজনার জেরে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল বুধবার সন্ধ্যায় জানান, ফেলান ‘অবিলম্বে’ পদত্যাগ করছেন।
এটি একটি আকস্মিক ঘোষণা। কারণ, বর্তমানে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চলাকালে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছে।
সূত্র জানায়, ফেলানকে সরানোর আগে হেগসেথ ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন এবং ফেলানকে জানান, তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তাঁকে বরখাস্ত করা হবে।
প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ একমত হয়েছেন, নৌবাহিনীতে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন।
ফেলানের বিদায়ের বিস্তারিত তথ্য সম্পর্কে জানতে নৌবাহিনী থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় থেকে মন্তব্য জানতে চেয়েও তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউস সিএনএনকে শন পার্নেলের দেওয়া বিবৃতি অনুসরণ করতে বলেছে।
পার্নেল ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিখেছেন, ‘যুদ্ধমন্ত্রী এবং উপযুদ্ধমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আমরা ফেলানকে বিভাগ ও মার্কিন নৌবাহিনীর প্রতি তাঁর সেবার জন্য ধন্যবাদ জানাই। আমরা তাঁর ভবিষ্যৎ প্রচেষ্টার সাফল্য কামনা করি। আন্ডার সেক্রেটারি হুং কাও নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত বেসামরিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’
ঠিক এ সময়ে এমন ঘোষণা দেওয়ায় তা কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কারণ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানি জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে নৌবাহিনী বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী ৩১টি জাহাজকে আবার বন্দরে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে এবং দুটি জাহাজে তল্লাশি চালিয়েছে।
একাধিক সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, ফেলান ও হেগসেথের মধ্যে কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চলছিল। হেগসেথ মনে করতেন, ফেলান জাহাজ নির্মাণ সংস্কার বাস্তবায়নে খুবই ধীরগতিতে কাজ করছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের সঙ্গে ফেলানের সরাসরি যোগাযোগও হেগসেথকে বিরক্ত করেছিল। বিষয়টিকে তাঁকে ডিঙিয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখতেন। এমনকি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গও জাহাজ নির্মাণ এবং নৌবাহিনীর ক্রয় বিভাগের প্রধান প্রধান দায়িত্ব নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছিলেন। এগুলো সাধারণত ফেলানের এখতিয়ারভুক্ত কাজ ছিল।
হোয়াইট হাউসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মতে, বুধবার হোয়াইট হাউসে জাহাজ নির্মাণ নিয়ে ট্রাম্প ও হেগসেথের মধ্যে বৈঠক চলাকালে এসব সমস্যা চরমে পৌঁছায়।
কর্মকর্তা জানান, জাহাজ নির্মাণের ধীরগতিতে ট্রাম্প নিজেও ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং বৈঠকের সময় তিনি নিশ্চিত হন, ফেলানকে পরিবর্তন করা দরকার। তিনি ও তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যিনি আরও দ্রুত কাজ করবেন।
ফেলান প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অধীন হওয়ায় হেগসেথকে বিষয়টি ‘নিষ্পত্তি’ করতে বলেন ট্রাম্প। এরপর হেগসেথ ফেলানকে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানান, তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা তাঁকে বরখাস্ত করা হবে।
তবে ওই কর্মকর্তা জানান, ফেলান সম্ভবত বিশ্বাস করতে পারেননি, এই বার্তার বিষয়ে ট্রাম্প জানতেন। তিনি দ্রুত হোয়াইট হাউসের অন্যান্য কর্মকর্তাকে ফোন করতে শুরু করেন। তাঁদের কাছে তিনি জানতে চান, তাঁরা তাঁর পদত্যাগের কথা শুনেছেন কি না এবং প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে জানেন কি না।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ঠিক সেই সময় পার্নেল তাঁর বিবৃতিটি প্রকাশ করেন।
হোয়াইট হাউসের অন্তত দুজন কর্মী ফেলানকে বলেন, এটি ট্রাম্পেরই সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু ফেলান তবু প্রেসিডেন্ট বা তাঁর ঘনিষ্ঠ কারও কাছ থেকে সরাসরি নিশ্চিত হতে চাইছিলেন। তিনি হোয়াইট হাউস চত্বরে এসে আইজেনহাওয়ার এক্সিকিউটিভ অফিস ভবনে পরিচিত কর্মকর্তাদের খোঁজ করেন এবং তথ্য জানতে চান।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এরপর ফেলান ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ করেন এবং ওয়েস্ট উইং লবিতে যান। ট্রাম্প তাঁর সঙ্গে সংক্ষেপে দেখা করেন এবং নিশ্চিত করেন, ফেলান আর তাঁর পদে নেই।
ফেলান একজন ব্যবসায়ী এবং তাঁর কোনো পূর্ব সামরিক অভিজ্ঞতা নেই। ২০২৫ সালে নৌবাহিনীর বেসামরিক প্রধান হিসেবে নিশ্চিত হওয়ার আগে তিনি ও তাঁর স্ত্রী ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে লাখ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছিলেন।
সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘জন ফেলান আমাদের নৌবাহিনীর সদস্যদের জন্য বিশাল শক্তি হবেন। তিনি আমার “আমেরিকা ফার্স্ট” স্বপ্ন এগিয়ে নিতে এক অবিচল নেতা হবেন। তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যবসাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখবেন।’
ট্রাম্পের অধীনে মনোনীত সামরিক বিভাগের বেসামরিক প্রধানদের মধ্যে ফেলানের বিদায়ই প্রথম। তবে পেন্টাগনের হাল ধরার পর থেকে হেগসেথ বিভিন্ন বাহিনীর অসংখ্য জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছেন।
ফেলানের বিদায়ের এ ঘোষণা এমন এক সপ্তাহে এল, যখন ওয়াশিংটন ডিসির ঠিক বাইরে বড় বার্ষিক সমুদ্র সম্মেলন ‘নেভি লিগস অ্যানুয়াল সি এয়ারস্পেস কনফারেন্স’ চলছিল। ফেলান ও নৌবাহিনীর অন্যান্য ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য দিয়েছিলেন।
এর আগে সিএনএন জানিয়েছিল, ফেলানের নাম একটি ফ্লাইটের তালিকায় দেখা গিয়েছিল, যা থেকে বোঝা যায়, ২০০৬ সালে তিনি কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেছিলেন। তালিকায় দেখা যায়, এপস্টিনসহ আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারী এবং ফরাসি মডেলিং এজেন্ট জঁ-লুক ব্রুনেলের সঙ্গে ভ্রমণ করেছিলেন ফেলান। ব্রুনেল এপস্টিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ২০২২ সালে তাঁকে কারাগারে মৃত অবস্থায় পাওয়ার সময় তাঁর বিরুদ্ধে নাবালিকা ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগে বিচার চলছিল।
ফেলানের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানিয়েছেন, তাঁকে উড়োজাহাজে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বিয়ার স্টার্নসের সিইও জিমি কেইন। এই ব্যক্তি ২০২১ সালে মারা গেছেন। ওই বন্ধু আরও বলেন, পৌঁছানোর আগে ফেলান জানতেন না, তাঁরা এপস্টিনের বিমানে ভ্রমণ করবেন এবং এর পর থেকে ফেলান কখনো এপস্টিনের সঙ্গে কথা বলেননি বা যোগাযোগ করেননি।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.