পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে আর্থিক প্রতিবেদনের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈশ্বিক মানদণ্ডের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে একটি সমন্বিত আর্থিক বাজার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে কারওয়ান বাজারের সিএ ভবনে আইসিএবি মিলনায়তনে যৌথভাবে এক সম্মেলনের আয়োজন করে দেশের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি পেশাজীবী সংস্থা—আইসিএবি, আইসিএমএবি, আইসিএসবি, আইআইএবি এবং এসিসিএ। “বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি: নিরীক্ষা, প্রতিবেদন প্রণয়ন, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পেশাজীবী সংস্থাগুলোর ভূমিকা” প্রতিপাদ্যের ওপর ভিত্তি করে এই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আইসিএবি প্রেসিডেন্ট সাব্বীর আহমেদ এবং সমাপনী বক্তব্য দেন আইসিএমএবি প্রেসিডেন্ট কাউসার আলম। এছাড়া প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আইসিএমএবি সভাপতি মি. আরিফ খান এফসিএমএ, এসিসিএ কান্ট্রি ম্যানেজার প্রমা খান, আইআইএবি প্রেসিডেন্ট এম. নুরুল আলম এবং আইসিএসবি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শাহজাহান।
আইসিএবি-র ভাইস প্রেসিডেন্ট আসিফুর রহমান এফসিএ “বিল্ডিং ইনভেস্টর রেজিলিয়েন্স: আইসিএবির রোল ইন রিপোর্টিং, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট” (বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রতিবেদন প্রণয়ন, সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আইসিএবি-র ভূমিকা) শীর্ষক একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, একজন বিনিয়োগকারী কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সাধারণত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, বিভিন্ন আর্থিক অনুপাত, ব্যবসার গতিশীলতা, আঞ্চলিক তুলনা ও মূল্যায়নসহ নানা বিষয় বিশ্লেষণ করেন। এসব সিদ্ধান্তের বড় একটি অংশ নির্ভর করে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের সততা ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর।
তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনে কোনো ধরনের অসঙ্গতি থাকলে বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আর বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর পড়ে না; পুরো পুঁজিবাজার ও দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আর্থিক প্রতিবেদনে যে তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তা যেন বাস্তবতার যথাযথ প্রতিফলন হয়, সেটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বলেন, হিসাব ও আর্থিক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সত্যতা উপস্থাপনের একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড রয়েছে। সেই গ্রহণযোগ্য মানের মধ্যে থেকেই আর্থিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। কারণ বৈশ্বিক পুঁজি অত্যন্ত গতিশীল। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারের সুযোগ বিবেচনা করে তাদের অর্থ স্থানান্তর করেন।
নিজের বিনিয়োগ অভিজ্ঞতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ভিয়েতনামে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা হয়েছিল, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেখানে তার কোনো বিনিয়োগ না থাকলেও ২০২২ সালে দুটি কোম্পানিতে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন তিনি। তার মতে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং, অর্থায়ন ও কমপ্লায়েন্সের মতো মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল বলেই এমন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তানভীর শাহরিয়ার গণি বলেন, দেশে আইসিএবি, আইসিএমএবি, এসিসিএ ও আইসিএসবি—সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানই রয়েছে। ফলে শুধু প্রতিষ্ঠান বা কাঠামো তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে হবে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক মানদণ্ড শুধু গ্রহণ করলেই হবে না, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই খাতের পাঁচটি কোম্পানির আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে যেন একই ধরনের মানদণ্ডে তাদের মূল্যায়ন করা যায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। খাতভেদে হিসাবের পদ্ধতিতে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে, তবে একই খাতের কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে তুলনাযোগ্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।
পেশাগত সততাকে আর্থিক বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, “প্রফেশনাল ইন্টিগ্রিটি ইজ আ সেলফ-ইমপোজড ডিসিপ্লিন।” অর্থাৎ পেশাগত সততা মূলত নিজের ওপর আরোপিত একটি শৃঙ্খলা। তবে আত্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহি ও শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
তিনি বলেন, আর্থিক বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে হবে। পেশাজীবী, কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সব পক্ষকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ভবিষ্যতের পুঁজিবাজারের জন্য কাজের মানোন্নয়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তানভীর শাহরিয়ার গনি।
তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট কারণ বা ঝুঁকির ইঙ্গিত ছাড়া এলোমেলোভাবে কোনো ফাইল বেছে নিয়ে পর্যালোচনা না করে নির্দিষ্ট ঝুঁকি-প্যারামিটারের ভিত্তিতে তদারকি করা উচিত। কোন বিষয় আগে পর্যালোচনা করা হবে, তা ঝুঁকির মাত্রা ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তানভীর শাহরিয়ার গনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিএসইসি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের পৃথক কাঠামোর মধ্যে কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে অর্থনীতির প্রতিটি অংশ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একটি ব্যাংক যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকে, একই প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে বিএসইসির নিয়ন্ত্রণের আওতাতেও থাকে।
তাই অর্থনীতিকে আলাদা আলাদা সিলোতে রেখে পরিচালনা করা কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিনিময় হার, করনীতি, ব্যাংকিং, বীমা, পুঁজিবাজার ও বৈদেশিক বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি খাতের সিদ্ধান্ত অন্য খাতেও সরাসরি প্রভাব ফেলে।
তিনি বলেন, “ ১০০ বিলিয়ন ডলারের ইকোনমিকে আলাদা আলাদা সিলোতে রেখে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।” অর্থনীতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্য, নীতি ও সিদ্ধান্তের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করে ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান মূলধনের চাহিদা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.