আইপিওর আগেই এআইবিরোধী জনরোষের মুখে অ্যানথ্রোপিক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে। এর মধ্যেই পুঁজিবাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক। তবে সাম্প্রতিক মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেটা সেন্টারবিরোধী ভোটের বড় ব্যবধান এবং প্রযুক্তি খাতের প্রতি মানুষের অনাস্থা কোম্পানিটির সম্ভাব্য আইপিওকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেটা সেন্টার নির্মাণসংক্রান্ত ৪১টি গণভোটের মধ্যে ৪০টিতেই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এনবিসি নিউজের এক্সিট পোল অনুযায়ী, কংগ্রেস নির্বাচনে কাকে সমর্থন করবেন, তা নির্ধারণে অর্ধেকের বেশি ভোটারের কাছে এআই ডেটা সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ বা বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।

শনিবার (৭ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নাসডাকে তালিকাভুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে অ্যানথ্রোপিক। প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য আইপিও প্রযুক্তি খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় পুঁজিবাজারে প্রবেশের ঘটনা হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটির সম্ভাব্য বাজারমূল্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশায় পরিবর্তন এসেছে। আগে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্যায়নের আলোচনা থাকলেও এখন বিনিয়োগকারীরা ১ ট্রিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্যায়ন লক্ষ্য করছেন বলে জানিয়েছে সিএনবিসি।

শুধু জনমতের চাপ নয়, পুঁজিবাজারেও এআই খাতের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। অক্টোবরে ২০২৫ সালের মার্চের পর সবচেয়ে খারাপ মাস পার করেছে নাসডাক। নভেম্বরের শুরুতেও সূচকটির পতন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে এআই অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত চিপ নির্মাতা ও ক্লাউড সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে বেশি চাপ দেখা যাচ্ছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে এআই নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেওয়া প্রার্থীরা মিশিগান, ওহাইও, টেক্সাস ও জর্জিয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে বড় জয় পেয়েছেন। এসব নির্বাচনী ফলাফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণবিজ্ঞানী মাউরা অস্টিন সিএনবিসিকে বলেন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কোনো এলাকার কাছাকাছি ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাধারণ মানুষ আগ্রহী নন। বিপুল বাজারমূল্য নিয়ে অ্যানথ্রপিকের পুঁজিবাজারে প্রবেশের উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানটিকে বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও ধনকুবেরদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারে।গত কয়েক মাসে এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে একাধিক আলোচিত ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিবেশগত প্রভাব, বিদ্যুতের বাড়তি বিল এবং কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা। ফলে এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ জোরালো হচ্ছে।

অ্যানথ্রোপিক ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এআই মডেল প্রশিক্ষণ এবং গ্রাহকদের সেবা দিতে অত্যাধুনিক ডেটা সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল। ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে তারা দ্রুত অবকাঠামো সম্প্রসারণ করছে।

অ্যানথ্রোপিক চলতি সপ্তাহে আইপিও-সংক্রান্ত সংশোধিত প্রসপেক্টাসে জানিয়েছে, ডেটা প্রসেসিং সক্ষমতা ও অবকাঠামো খাতে তাদের প্রায় ৮৯৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ক্রয় ও লিজ চুক্তির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর প্রায় পুরোটাই কম্পিউটিং সক্ষমতা ও অবকাঠামো-সংশ্লিষ্ট ব্যয়।

কোম্পানিটির প্রসপেক্টাসে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে বিরোধিতা সংগঠিত রূপ নিচ্ছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর অ্যানথ্রপিকের পরিচিতি ও জনসমক্ষে উপস্থিতি বাড়লে তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোও বাড়তি নজরদারির মুখে পড়তে পারে।

গার্টনারের বিশ্লেষক নিকোল গ্রিনের মতে, প্রযুক্তিটির ব্যাপক পরিবর্তনশীল প্রভাবের কারণে অ্যানথ্রপিকের কর্মকর্তাদের এআইবিরোধী জনমত মোকাবিলার প্রস্তুতি আগে থেকেই থাকার কথা। তাঁর ভাষায়, এআই নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় ও আগ্রহ—দুই ধরনের প্রবল আবেগ রয়েছে। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারিও বাড়বে।

অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই গত আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে এআই নিয়ে জনমনে নেতিবাচক মনোভাবের কথা স্বীকার করেন। তিনি এটিকে আস্থার সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, মানুষ মনে করছে প্রযুক্তি কোম্পানি, সরকার ও প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টরা সব সময় নতুন কোনো উপায়ে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার প্রকাশিত এক জরিপেও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনাস্থার চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা ডেটা সেন্টার নির্মাণের ক্ষেত্রে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সমাজের স্বার্থে কাজ করবে—এমন বিষয়ে একেবারেই আস্থা রাখেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়টির শেফার ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ওয়ান্ডি ব্রুইন দে ব্রুইন বলেন, একবার মানুষের আস্থা হারালে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। জরিপের ফলাফলও ইতিবাচক নয়।

অন্যদিকে, রেনেসাঁ ক্যাপিটালের জ্যেষ্ঠ আইপিও বাজার কৌশলবিদ ম্যাট কেনেডির মতে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে অ্যানথ্রপিকের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় শুধু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে কোনো কোম্পানিকে বেশি সমালোচনার মুখে পড়তে হওয়া উচিত নয়।

এআই মডেল ক্লডের নির্মাতা অ্যানথ্রোপিক দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তাসচেতন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। ওপেনএআইয়ের সাবেক কয়েকজন গবেষককে নিয়ে দারিও আমোদেই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। এত দিন মূলত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সেবা দেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে এআই বিতর্কের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেনি তারা। তবে সম্ভাব্য আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে প্রবেশ করলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, বিনিয়োগ ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে নজরদারি আরও বাড়তে পারে।

 

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.