যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অবকাঠামো সম্প্রসারণে ধীরগতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে প্রযুক্তি ও চিপ নির্মাতা কোম্পানিগুলোর শেয়ারে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর এক দিনে সূচকটির সর্বোচ্চ পতন।
এদিন এআই অবকাঠামো খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা যায়। এনভিডিয়া ও কোয়ালকমের শেয়ারদর ৯ শতাংশের বেশি কমেছে। এর মধ্যে এনভিডিয়ার বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেস (এএমডি), মাইক্রন ও অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালসের শেয়ারদর দুই অঙ্কের হারে কমেছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দরপতনের মুখে পড়েছে ক্লাউড অবকাঠামো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কোরউইভ।
সিএনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই খাতের অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রত্যাশিত আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত মূলধন ব্যয়ের আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়। এতে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা।
ওয়ানপয়েন্ট বিএফজি ওয়েলথ পার্টনার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা পিটার বুকভার সিএনবিসিকে বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে। তবে এআই অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণের গতি কমে গেলে পুঁজিবাজারে তার প্রভাব পড়বে।
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থাকা কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছেন। টেক্সাস ও ওহাইওতে গভর্নর ও সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হয়েছেন। জর্জিয়াতেও গভর্নর নির্বাচনে জয় পেয়েছে দলটি।
এ ছাড়া ১০টি অঙ্গরাজ্যে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপসংক্রান্ত ৪১টি স্থানীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ব্যালটপিডিয়া ও সিএনবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নর্থ ডাকোটার হারউডের একটি প্রস্তাব ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রেই ভোটাররা ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারাও। বুধবার রাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রযুক্তিবিষয়ক সম্মেলনে মেটার প্রেসিডেন্ট দিনা পাওয়েল ম্যাককরমিক বলেন, নির্বাচনের পর ডেটা সেন্টার নির্মাণ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে মেটা, অ্যালফাবেট, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ব্যয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক প্রান্তিকে মেটা ফ্রি ক্যাশ ফ্লোতে ঋণাত্মক অবস্থায় গেছে। এর আগের প্রান্তিকে একই পরিস্থিতিতে পড়েছিল অ্যালফাবেট ও অ্যামাজন। বৃহস্পতিবার এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
এদিকে চিপ নির্মাতা কোয়ালকমের শেয়ারেও বড় পতন হয়েছে। চলতি প্রান্তিকের আয় নিয়ে হতাশাজনক পূর্বাভাস দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারে বিক্রির চাপ বাড়ে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির ডেটা সেন্টার ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তবে সামগ্রিক ব্যবসার তুলনায় এ খাত এখনো ছোট।
কোয়ালকমের প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টিয়ানো আমন জানিয়েছেন, ডেটা সেন্টার ব্যবসায় চাহিদার সংকট নেই; বরং সরবরাহের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক মেমোরি চিপের সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে কোয়ালকম, ইন্টেল ও এএমডির মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু কোম্পানিগুলোর আয় বা প্রবৃদ্ধির দিকে তাকাচ্ছেন না; বরং এআই প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে ভবিষ্যতে কতটা আয় আসবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। ফলে এআই খাতের প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো সম্প্রসারণের টেকসই সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.