আমানত ও রেমিট্যান্সে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ইসলামি ধারার ব্যাংক

দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ ও স্থবিরতা কাটিয়ে ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে দেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে এসব ব্যাংকের আমানত, বিনিয়োগ, প্রবাসী আয় ও আমদানিতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে একই সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের মাসভিত্তিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

দেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ধারার ব্যাংক রয়েছে ১০টি। এগুলো হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট শেষে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর মোট জনবল দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ১২৪ জনে। জুলাই শেষে এ সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ১১৫ জন। এসব ব্যাংকের মধ্যে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

আমানতে এক মাসে বেড়েছে ৩ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা

আগস্ট শেষে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫০ কোটি টাকা। জুলাই শেষে এ পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। ফলে এক মাসে আমানত বেড়েছে ৩ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা বা প্রায় শূন্য দশমিক ৯০ শতাংশ। তবে ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় আমানত কমেছে ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি

ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে অর্থায়নেও অবদান রাখছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। আগস্ট শেষে এসব ব্যাংকের মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। জুলাই শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৮ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের আগস্টে বিনিয়োগ ছিল ৫ লাখ ২৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা।

সে হিসাবে এক মাসে বিনিয়োগ বেড়েছে ৭৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বা প্রায় ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

রেমিট্যান্স বেড়েছে ১৬ শতাংশ

প্রবাসী আয় আহরণে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো। আগস্টে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। জুলাইয়ে এসেছিল ৫৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ফলে এক মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ।

আমদানি বাড়লেও কমেছে রপ্তানি আয়

বৈদেশিক বাণিজ্যে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। আগস্টে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানি হয়েছে ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ফলে এক মাসে আমদানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।

অন্যদিকে, আগস্টে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৫২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। জুলাইয়ে এ পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ডলার। ফলে এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার।

পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক হতে চায় এনসিসি ব্যাংক

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে রূপান্তরের প্রস্তুতি শুরু করেছে বেসরকারি খাতের এনসিসি ব্যাংক। ইতিমধ্যে ব্যাংকটির চারটি শাখাকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তর করা হয়েছে। চলতি বছর আরও কয়েকটি শাখাকে এভাবে রূপান্তর এবং ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগ শুরু করেছে ব্যাংকটি। আগামী বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় রূপরেখা ও নথিপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছে এনসিসি ব্যাংক।

এর আগে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক নাম পরিবর্তন করে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক এবং এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক নাম পরিবর্তন করে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক হয়। একইভাবে এনসিসি ব্যাংকেরও নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

এনসিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান নূরুন নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চাই এনসিসি ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক হয়ে উঠুক। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যত নির্দেশনা আছে, তা মেনে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি আগামী বছরে পূর্ণ ইসলামি ব্যাংক হিসেবে রূপান্তর হবে এনসিসি ব্যাংক।’

ব্যাংক খাতে ইসলামি ধারার ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ায় অনেক ব্যাংক এ ধরনের কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহী হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো এক চিঠিতে ৬২টি প্রচলিত শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর অনুমতি চেয়ে আবেদন করে এনসিসি ব্যাংক। এসব শাখাকে পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং শাখায় রূপান্তরের পরিকল্পনাও জানিয়েছে ব্যাংকটি। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে আরও ৪০টি শাখায় ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডো চালুর অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এনসিসি ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমে মোট আমানতের পরিমাণ ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। বিনিয়োগের জন্য আরও ৮০০ কোটি টাকা ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংকটি সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ করেছে ৪৪৮ কোটি টাকা।

এনসিসি ব্যাংক জানিয়েছে, ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোগুলোর মাধ্যমে তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়ছে। কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক ফাইন্যান্সের (বিআইআইএফ) মাধ্যমে ৩৬৩ জন কর্মকর্তাকে ছয় দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অনলাইন ও সরাসরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ব্যাংকের সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.