ট্রেডিং বাড়ালেই শক্তিশালী পুঁজিবাজার হয় না, মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন বাড়াতে হবে: বিএসইসি চেয়ারম্যান
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, শুধু ট্রেডিংয়ের পরিমাণ বাড়ালেই একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার তৈরি হবে না। বাজারের আকার বড় করতে হলে মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন বাড়াতে হবে। এ জন্য আইপিওর সংখ্যা ও মান বাড়ানো, ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশ এবং করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণের ওপর জোর দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসই টাওয়ারের মাল্টিপারপাস হলে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি) ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএসইসির কমিশনার নাফিজ আল তাইক, ডিএসইর চেয়ারম্যান মোমিনুল ইসলাম এবং সিএসইর চেয়ারম্যান এ কে এম হাবিবুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটাল সার্ভিসেস লিমিটেডের সিইও মো. মোমিনুল হক। প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক আল-আমিন, বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক মো. শফিউল আযম, ডিএসইর সিটিও ড. মো. আসিফুর রহমান ও বিএমবিএর প্রেসিডেন্ট ইফতেখার আলম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএপিএলসির প্রেসিডেন্ট রিয়াদ মাহমুদ।
মাসুদ খান বলেন, ‘আমরা শুধু রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রেগুলেশন করছি না। আমরা বাজারকে কীভাবে আরও কার্যকর ও উন্নত করা যায়, সেই লক্ষ্যেই রেগুলেশন করছি।’ তিনি জানান, বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
মার্কেট ক্যাপ জিডিপির মাত্র ৬ শতাংশ
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন জিডিপির মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। ফলে পুঁজিবাজারের আকার বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারের পুরো ইকোসিস্টেম অনেকাংশে ট্রেডিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাজারের আকার যত বড় হবে, তালিকাভুক্ত কোম্পানি যত বাড়বে এবং নতুন মূলধন যত বেশি আসবে, পুরো ইকোসিস্টেমের আয় ও কার্যক্রম তত বিস্তৃত হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের তাই শুধু আজকের ট্রেডিং ভলিউম নিয়ে চিন্তা করলে হবে না। দীর্ঘমেয়াদে একটি বড়, গভীর, বৈচিত্র্যময় ও কার্যকর পুঁজিবাজার তৈরি করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’
ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে জোর
মিউচুয়াল ফান্ড প্রসঙ্গে ভারতের উদাহরণ টেনে মাসুদ খান বলেন, সেখানে এ শিল্প প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করছে। বাংলাদেশেও এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষভাবে ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
আইপিও প্রক্রিয়া বদলানোর ঘোষণা
আইপিও প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে একটি কোম্পানির আইপিও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এক থেকে দেড় বছর বা তারও বেশি সময় লেগেছে। ‘এভাবে চলতে পারে না। এই প্রক্রিয়া পরিবর্তন করতেই হবে এবং আমরা সেটি পরিবর্তন করব।’
তার ভাষ্য, অতীতে কাগজপত্রের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। এখন কোম্পানির অতীত আর্থিক কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, ব্যবসায়িক মডেলের শক্তি ও সুনাম দেখা হবে। পাশাপাশি ইএসজি বিবেচনায় নিতে হবে। আইপিও অনুমোদনে এখন আরও কঠোর মানদণ্ড প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বড় কোম্পানিকে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহ দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তালিকাভুক্ত হওয়া শুধু একটি নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা নয়; এটি ব্যবসা সম্প্রসারণ, মূলধন সংগ্রহ এবং কোম্পানির মূল্য বাড়ানোর একটি সুযোগ।’ এ জন্য বিএসইসি থেকে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
করপোরেট বন্ড ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশে করপোরেট বন্ড মার্কেটের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে। এ বিষয়ে একটি বড় পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। এই বাজার শক্তিশালী করতে মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ফান্ড ও বিমা কোম্পানির লাইফ ফান্ডের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
নিবন্ধিত ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট প্রসঙ্গে তিনি জানান, কী যোগ্যতা ও মানদণ্ডে নিবন্ধন দেওয়া হবে, সে বিষয়ে ব্লুপ্রিন্ট তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। নিয়ন্ত্রকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করতে চাই না। তবে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পরিদর্শন ও তদারকি অবশ্যই থাকবে।’ পুঁজিবাজারের উন্নয়ন শুধু বিএসইসি একা করতে পারবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ট্রেজারি বিভাগসহ সব নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
অডিট ও ক্রেডিট রেটিং
অডিট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অডিটরদের শুধু আর্থিক সংখ্যা দেখলে হবে না; ব্যবসায়িক মডেল বাস্তবসম্মত কি না এবং আর্থিক বিবরণীর সঙ্গে ব্যবসার বাস্তব চিত্রের মিল আছে কি না, তাও দেখতে হবে। ভালো মানের অডিট নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে থাকবে বিএসইসি। ক্রেডিট রেটিংয়ের ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি বলে মত দেন তিনি।
ডিজিটালাইজেশন অপরিহার্য
ডিজিটালাইজেশনকে বিএসইসির বড় উদ্যোগগুলোর একটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতের পুঁজিবাজারে ডিজিটালাইজেশন কোনো বিকল্প নয়; এটি অপরিহার্য।’ তিনি জানান, ট্র্যাকিং সিস্টেমের একটি প্রোটোটাইপ তৈরি হয়েছে এবং আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে আরও উন্নত ট্র্যাকিং সফটওয়্যার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে একটি ইউনিফায়েড বা একীভূত সফটওয়্যার ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
মাসুদ খান বলেন, লক্ষ্য এমন একটি পুঁজিবাজার গড়ে তোলা, যেখানে স্বচ্ছতা থাকবে, কার্যক্রম হবে সুশৃঙ্খল এবং বাজার টেকসইভাবে বিকশিত হবে। ‘শেষ পর্যন্ত এই লক্ষ্য অর্জনের দায়িত্ব আমাদের সবার।’
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.