বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করার কথা ভাবছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ অবস্থায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে নিজেদের কিছু মজুত ডিজেল ছেড়ে দিতে বলতে পারেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ইউরোপকে অবিলম্বে মজুত থেকে ডিজেল ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বেসেন্ট বলেছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ‘আমেরিকান কৃষক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের’ এর বোঝা বহন করতে দেওয়া উচিত নয়।
ইরান যুদ্ধের কারণে ডিজেলের মূল্য বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি সীমিত করার হুমকি দিয়েছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন ভোটারদের কাছেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার সম্ভাব্য ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া নিয়ে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করেছে যুক্তরাজ্য।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডিজেল সরবরাহকারী দেশ। দেশটি প্রতিদিন ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানি বন্ধ করলে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ডিজেলের দামে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাজ্যেও চলতি সপ্তাহে ডিজেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। মোটরচালকদের সংগঠন আরএসি জানিয়েছে, দেশটিতে ডিজেলের গড় দাম এখন প্রতি লিটারে ২০০ পেন্সের সামান্য নিচে। সর্বশেষ হিসাবে দাম দাঁড়িয়েছে ১৯৯ দশমিক ৭৯ পেন্স, যা আগের ১৪২ দশমিক ৩৮ পেন্সের তুলনায় অনেক বেশি।
সপ্তাহান্তে ট্রাম্প বলেছিলেন, ডিজেল রপ্তানি বন্ধের বিষয়টি তাঁরা ‘খুব গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছেন’। বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের কিছু ডিজেল মজুত ছাড়তে বলতে পারেন। একই দিন বেসেন্টও ইউরোপকে তা ‘অবিলম্বে’ করার আহ্বান জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বেসেন্ট বলেন, ‘আমাদের ইউরোপীয় অংশীদারদের বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজ দ্রুততর করা এবং চলমান সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন মোকাবিলায় অতিরিক্ত সরবরাহ অবিলম্বে উন্মুক্ত করা উচিত।’
নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম নিয়ে চাপ
নভেম্বরের নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে। ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রত্যাশায় রিপাবলিকানদের হয়ে ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রচারে যাওয়ার কথা রয়েছে।
সম্ভাব্য মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন যুক্তরাজ্যের জ্বালানিমন্ত্রী মার্টিন ম্যাকক্লাসকি।
আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র এক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসহ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা যুক্তিযুক্ত হবে। তবে বছরের শুরুতে কৌশলগত জ্বালানি মজুত থেকে সমন্বিতভাবে কিছু মজুত ছাড়ার পরও ইউরোপের হাতে এখনো কিছু মজুত রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাজ্য সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমাদের সরবরাহব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিস্থাপক। আমরা আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং যুক্তরাজ্যের জ্বালানি শিল্পের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি।’ তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য ডিজেল সংকট নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলে সরকার মনে করছে। তবে দাম আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।
ইউরোপীয় কমিশনের এক মুখপাত্রও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ডিজেল পরিস্থিতি নিয়ে ‘অনেক ফোনকল, অনেক বৈঠক’ হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের ‘উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগও’ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ, বাড়ছে জ্বালানির দাম
ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আগ্রাসন শুরুর পর বিশ্বজুড়ে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলজাত পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এর সঙ্গে ডিজেলের আরেক বড় সরবরাহকারী রাশিয়ার রপ্তানি নিষেধাজ্ঞাও বাজারে চাপ বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের উদ্বৃত্ত ব্যারেল দেশের ভেতরে রেখে দিলে পাম্পে দাম কমবে বলে মনে করছেন ট্রাম্প। তাঁর মতে, এতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে চালক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিক স্বস্তি পাবেন। তবে আর্গাস মিডিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ফাইফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্য আমদানিনির্ভর
পেট্রলের তুলনায় ডিজেল পরিশোধন করা কঠিন। আবার পরিবহন ও কৃষি খাতে ব্যাপক ব্যবহারের কারণে ডিজেলের চাহিদা কমানোও কঠিন।
ডিজেলের জন্য যুক্তরাজ্য অনেকটাই আমদানিনির্ভর। দেশটির চারটি শোধনাগার অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় বেশি পেট্রল উৎপাদন করতে পারে, তবে প্রয়োজন মেটানোর মতো পর্যাপ্ত ডিজেল উৎপাদন করে না।
যুক্তরাজ্যের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষে দেশটির সড়কে ১ কোটি ৫১ লাখ ডিজেলচালিত যানবাহন ছিল। এক বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৭ লাখ। এর মধ্যে ডিজেলচালিত গাড়ি ছিল ৯৮ লাখ, যা এক বছর আগে ছিল ১ কোটি ৪ লাখ।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.