বিশ্ববাজারে ফের বাড়ল তেলের দাম, ৪৪ বছরের সর্বনিম্নে মার্কিন মজুত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুত ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম।

মঙ্গলবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৪৯ ডলার বা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ৭৭ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৩৪ ডলার বা ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৯৩ দশমিক ৯৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগের কার্যদিবসেও দুই ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১ ডলার করে বেড়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি বাড়তে শুরু করলেও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বাভাবিকতা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি বাড়ার বিষয়টি এখন স্পষ্ট। তবে বাড়তি সরবরাহের বড় অংশ এখনো প্রচলিত প্রক্রিয়ায় বাজারে আসছে না। জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মতো বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এসব পদ্ধতিতে খরচ বেশি এবং কার্যকারিতাও তুলনামূলক কম হওয়ায় তেলের দাম কমার বদলে বাড়ছে।

তেলবাজারের তথ্য সরবরাহকারী কেপলারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ২৮ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির পর এটি সর্বোচ্চ রপ্তানি। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি বৃদ্ধির কারণেই মূলত এ পরিমাণ বেড়েছে।

এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাত মাস ধরে চলা সংঘাত বন্ধে নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। দুই দেশের কর্মকর্তারা সোমবার পৃথকভাবে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ইরান সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণ করেনি। এখন ওই প্রস্তাবে সংশোধন এনে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউওবি ব্যাংকের বিশ্লেষকেরা এক নোটে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং এর প্রভাবে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা বর্তমানে প্রধান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

বিশ্লেষকেরা আরও জানান, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে ইরানের কর্মকর্তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। ফলে তেল সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো যথেষ্ট বেশি।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজারে এবং বেড়েছে জ্বালানিপণ্যের দাম।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমাতে ডিজেল বিক্রির ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে জানা গেছে, প্রস্তাবটি কার্যকর হলে নির্দিষ্ট কিছু ক্রেতা কেন্দ্রীয় সরকারের জ্বালানি কর ছাড়াই ডিজেল কিনতে পারবেন। ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বিকল্প হিসেবে কয়েক দিনের আলোচনার পর এ উদ্যোগ সামনে এসেছে।

৪৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন মার্কিন তেলের মজুত

চলমান সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বা এসপিআরও দ্রুত কমছে। দেশটির জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহ শেষে এসপিআরের মজুত দাঁড়িয়েছে ২৮ কোটি ৩৮ লাখ ব্যারেলে। ১৯৮২ সালের অক্টোবরের পর এটিই দেশটির সর্বনিম্ন কৌশলগত তেলের মজুত।

একটি চুক্তির আওতায় এসপিআর থেকে মোট ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার কথা রয়েছে। চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিপুল পরিমাণ তেল মজুত থেকে বাজারে ছাড়ার কারণেও এসপিআরের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত মজুতের এই পতনের ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের তা মোকাবিলার সক্ষমতা কিছুটা সীমিত হতে পারে। একই সঙ্গে মজুত পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজার থেকে বড় পরিমাণে তেল কেনা শুরু করলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়বে। এতে তেলের দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.