সরকারি ক্রয় আইন সংস্কার, নাকি অবাধ সিদ্ধান্তের সুযোগ?

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক আইন সংস্কার একদিকে দেশীয় শিল্প, নবীন উদ্যোক্তা ও নতুন নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত বিবেচনাধিকার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও সামনে এনেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মোঃ আল আমিন ভূঁঞার মতে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ক্ষমতা ও নমনীয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির কাঠামোও সমানভাবে শক্তিশালী করা জরুরি।

গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬-এর অধিকতর সংশোধনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে অধ্যাদেশের মাধ্যমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ নামে অভিহিত এই সংশোধনীতে সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ শ্রেণির অন্তর্ভুক্তি, নতুন নিবন্ধিত ব্যক্তি ও নবীন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি, দেশীয় পণ্য ক্রয়ে অগ্রাধিকার এবং সীমিত ক্রয় পদ্ধতির প্রয়োগসহ বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মোঃ আল আমিন ভূঁঞা তার বিশ্লেষণে প্রশ্ন তুলেছেন—এসব সংস্কার বাস্তবে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করবে, নাকি কিছু ক্ষেত্রে এমন বিবেচনাধিকার তৈরি করবে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা স্বার্থগোষ্ঠী বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে?

সরকারি ক্রয়ের গুরুত্ব

সরকারি ক্রয় শুধু পণ্য, কাজ বা সেবা কেনার বিষয় নয়; এটি জনগণের অর্থ ব্যবহারের অন্যতম বৃহৎ ক্ষেত্র। একটি সড়ক নির্মাণ থেকে শুরু করে সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল, শিক্ষা অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা সরকারি সেবা—প্রায় প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে সরকারি ক্রয় ও চুক্তি জড়িত। এসব ব্যয়ের অর্থ শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ, অর্থাৎ করদাতার অর্থ।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। ফলে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহির ঘাটতি তাই কোনো দপ্তরের নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এর সরাসরি আর্থিক প্রভাব পড়ে জনগণের ওপর। কোনো প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, অতিমূল্যায়িত দর, নিম্নমানের কাজ, অযৌক্তিক মূল্য পরিবর্তন, অপ্রতিযোগিতামূলক ক্রয় কিংবা দুর্নীতির কারণে যে অর্থ অপচয় হয়, সেটি মূলত জনগণের অর্থেরই অপচয়।

অতীতের বিভিন্ন গবেষণাতেও সরকারি ক্রয় ও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম, যোগসাজশ এবং প্রতিযোগিতার ঘাটতির গুরুতর চিত্র উঠে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের একটি গবেষণায় ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সড়ক ও সেতু-সংক্রান্ত উন্নয়নকাজে মোট ব্যয়ের ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে।

এমন বাস্তবতায় সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি শক্তিশালী, স্পষ্ট, প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ সরকারি ক্রয় আইন শুধু প্রয়োজনীয় নয়, অপরিহার্য।

তবে এখানেই মূল প্রশ্ন—শুধু আইন থাকলেই কি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা স্বচ্ছ হবে?

মোঃ আল আমিন ভূঁঞার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর উত্তর নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—আইনের ভাষা কতটা স্পষ্ট, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ কতটা কাঠামোবদ্ধ, মূল্যায়ন কতটা বস্তুনিষ্ঠ, সিদ্ধান্তের কারণ কতটা প্রকাশযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কতটা জবাবদিহির মধ্যে থাকবেন।

অর্থাৎ, একটি ভালো ক্রয় আইন শুধু ক্ষমতা দেওয়ার বিষয় নয়; সেই ক্ষমতা কীভাবে, কোন মানদণ্ডে এবং কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হবে, সেটিই হতে পারে এর প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

সংস্কারের উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য ঝুঁকি

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, ক্রয়চুক্তি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করা। এসব উদ্দেশ্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই।

তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মোঃ আল আমিন ভূঁঞার পর্যবেক্ষণ হলো, সংস্কারের পাশাপাশি বিবেচনাধিকার কতটা বাড়ছে এবং সেই ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় কোনো একটি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি সুবিধা না দিয়েও যোগ্যতা নির্ধারণ, মূল্যায়ন, কারিগরি স্পেসিফিকেশন, দেশীয় শিল্পের সংজ্ঞা, সীমিত দরপত্র কিংবা বিশেষ ক্রয়পদ্ধতির মতো জায়গায় অতিরিক্ত বিবেচনাধিকার থাকলে পরোক্ষভাবে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দেশীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার: মানদণ্ড কতটা স্পষ্ট?

দেশীয় শিল্প সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় মূল্য সংযোজন এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন উৎসাহিত করা রাষ্ট্রের একটি যৌক্তিক নীতিগত লক্ষ্য হতে পারে।

কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—‘দেশীয় শিল্প’ বলতে কাকে বোঝানো হবে?

বাংলাদেশে নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশীয় শিল্প হিসেবে বিবেচিত হবে? নাকি স্থানীয় মালিকানা, উৎপাদন, স্থানীয় মূল্য সংযোজন কিংবা স্থানীয় কর্মসংস্থানের নির্দিষ্ট শর্ত থাকবে? আমদানিকারক, পরিবেশক, উৎপাদনকারী এবং সমন্বিত প্রযুক্তি-সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কীভাবে পার্থক্য করা হবে?

মোঃ আল আমিন ভূঁঞার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব বিষয় বস্তুনিষ্ঠ ও পরিমাপযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা না হলে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার নীতি বিশেষ সুবিধা প্রদানের ইচ্ছাধীন ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আর যেখানে ইচ্ছাধীন সুবিধা প্রদানের সুযোগ থাকে, সেখানে স্বার্থের সংঘাত, প্রভাব ও পক্ষপাতের সম্ভাবনাও বাড়ে।

সীমিত দরপত্র ও বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থা

সীমিত দরপত্রের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসে। বিশেষায়িত পণ্য, সীমিত সরবরাহকারী বাজার বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সীমিত দরপত্র প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিযোগিতার পরিধি কমে যায়।

তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত—কেন দরপত্র সীমিত করা হলো? কোন বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ডের ভিত্তিতে সরবরাহকারী নির্বাচন করা হলো? একই যোগ্যতার অন্য প্রতিষ্ঠানকে কেন সুযোগ দেওয়া হলো না? সিদ্ধান্তটি কি পরবর্তীতে নিরীক্ষা বা স্বাধীন পর্যালোচনার আওতায় আনা যাবে?

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মোঃ আল আমিন ভূঁঞার মতে, সীমিত দরপত্র একটি প্রয়োজনীয় ক্রয়পদ্ধতি হতে পারে। তবে এটি যেন প্রতিযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার সহজ পথ না হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিযোগিতার পরিধি যত সীমিত হবে, সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ব্যাখ্যাও তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। জরুরি জাতীয় প্রয়োজনে বিশেষ ক্রয়ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। বাস্তব পরিস্থিতিতে সব ক্রয়ের জন্য একই দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা সম্ভব নয়।

কিন্তু ‘জরুরি প্রয়োজন’ একটি সংবেদনশীল বিষয়। এর সংজ্ঞা অস্পষ্ট হলে একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা ধীরে ধীরে নিয়মিত ক্রয়ের বিকল্প পথে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জরুরিতার কারণ, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, সরবরাহকারী নির্বাচনের ভিত্তি, মূল্যের যৌক্তিকতা এবং পরবর্তী পর্যালোচনার ব্যবস্থা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের ঝুঁকি

সংশোধনীর মাধ্যমে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন মোঃ আল আমিন ভূঁঞা।

তার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একটি আইন বা বিধিমালা নিরপেক্ষ ভাষায় প্রণীত হলেও, প্রয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ থাকলে পক্ষপাত বা প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

একজন কর্মকর্তা যদি নির্দিষ্ট মানদণ্ড, প্রমাণ এবং নম্বর প্রদানের সুস্পষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে বাধ্য থাকেন, তাহলে বাইরের প্রভাব প্রয়োগের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমে যায়। বিপরীতে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের বড় অংশ যদি ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল হয় এবং সিদ্ধান্তের কারণ পর্যাপ্তভাবে নথিবদ্ধ না থাকে, তাহলে প্রভাব বিস্তার বা পক্ষপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার মূল সুরক্ষা হওয়া উচিত বস্তুনিষ্ঠ ও পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড, স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য মূল্যায়ন পদ্ধতি, যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণ এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তের নিরীক্ষাযোগ্যতা নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে, যেখানে কর্মকর্তার বিবেচনাধিকার থাকবে, সেখানে সেই বিবেচনাধিকার সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা, লিখিতভাবে কারণ দর্শানো এবং প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার সুযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

অনলাইন ক্রয়ব্যবস্থা কি যথেষ্ট?

বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। দরপত্র দাখিল, উন্মুক্তকরণ, যোগাযোগ এবং নথিপত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এটি স্বচ্ছতা ও অনুসরণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

কিন্তু ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা থাকলেই সরকারি ক্রয় পুরোপুরি নিরপেক্ষ হয়ে যায় না।

ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে যে দরপত্র অনলাইনে দাখিল হয়েছে। কিন্তু কারিগরি স্পেসিফিকেশন কে তৈরি করেছে, সেই স্পেসিফিকেশন কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা সরবরাহকারীর সুবিধা করছে কি না, কারিগরি মানদণ্ড কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, সীমিত দরপত্র কেন করা হয়েছে অথবা মূল্যায়নকারী কীভাবে কারিগরি নম্বর দিয়েছেন—এসব প্রশ্ন ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা নিজে থেকে সমাধান করে না।

অর্থাৎ, ডিজিটাল ক্রয়ব্যবস্থা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে; কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন।

কারিগরি স্পেসিফিকেশন বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দরপত্র কাগজে-কলমে উন্মুক্ত হতে পারে, কিন্তু কারিগরি বিবরণ যদি এমনভাবে তৈরি করা হয়, যা বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড, মডেল বা সরবরাহকারীর সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে মিলে যায়, তাহলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।

তাই উচ্চমূল্যের ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড-নিরপেক্ষ কারিগরি স্পেসিফিকেশন, বাজার বিশ্লেষণ, পরিমাপযোগ্য কারিগরি শর্ত এবং প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে কারিগরি বিবরণ পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তিসংবলিত ক্রয় সিদ্ধান্ত। কোনো দরদাতা কেন বাদ পড়ল, কোন মানদণ্ডে কত নম্বর পেল, অন্য দরদাতা কেন বেশি নম্বর পেল, কেন সীমিত দরপত্র করা হলো, কেন বিকল্প ক্রয়ব্যবস্থা প্রয়োজন হলো কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান কেন দেশীয় শিল্প হিসেবে বিশেষ সুবিধা পেল—এসব সিদ্ধান্তের কারণ ক্রয় নথিতে স্পষ্ট থাকা উচিত।

মোঃ আল আমিন ভূঁঞার মতে, স্বচ্ছতা শুধু দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নাম নয়। স্বচ্ছতার অর্থ হলো সিদ্ধান্তটিও যেন ব্যাখ্যা করা যায়। একজন ব্যর্থ দরদাতা, নিরীক্ষক কিংবা পর্যালোচনাকারী কর্তৃপক্ষ যেন ক্রয় নথি দেখে সিদ্ধান্তের যুক্তি বুঝতে পারেন—এটাই প্রকৃত জবাবদিহি।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা থেকে সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বাদ দেওয়া সম্ভব বা প্রয়োজনীয় নয়। বাস্তব পরিস্থিতিতে ক্রয় কর্তৃপক্ষকে কিছু নমনীয়তা দিতেই হবে। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা এক বিষয় নয়।

প্রয়োজন কাঠামোবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে থাকবে নির্দিষ্ট মানদণ্ড, পূর্বনির্ধারিত ওজন, প্রমাণ, অনুমোদন, নিরীক্ষার নথিপথ এবং পর্যালোচনার ব্যবস্থা।

আরও যেসব মৌলিক বিষয়ে সংস্কারের প্রয়োজন ছিল
১. রিটেনশন মানি

১০ শতাংশ রিটেনশন মানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে সরবরাহকারী বা ঠিকাদারের কার্যকরী মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি পারফরম্যান্স সিকিউরিটির সঙ্গে অতিরিক্ত নিরাপত্তা-ভার তৈরি হয়ে প্রকল্পের অর্থায়ন ব্যয় বাড়তে পারে।

তাই রিটেনশন মানির হার, সর্বোচ্চ সময়সীমা ও ফেরত দেওয়ার পদ্ধতি আরও স্পষ্ট এবং ঝুঁকিভিত্তিকভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। কম ঝুঁকির ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় অর্থ আটকে না রেখে দ্রুত ফেরতের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

২. প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা

প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণে প্রকল্পের প্রকৃতি ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। সব ধরনের ক্রয়ের জন্য একই সময়সীমা নির্ধারণ যৌক্তিক নয়।

বিশেষ করে আমদানিনির্ভর সরবরাহ, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত প্রকল্পে ক্রয়, উৎপাদন, জাহাজীকরণ, কাস্টমস ছাড়করণ, স্থাপন ও পরীক্ষণের জন্য তুলনামূলক বেশি সময় প্রয়োজন হয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে ৬০ দিনের সময়সীমা পর্যাপ্ত নাও হতে পারে।

সুতরাং প্রকল্পের প্রকৃতি ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে সময়সীমার যৌক্তিকতা পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

৩. সিগনিফিক্যান্ট লোয়েস্ট টেন্ডার

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট সংশোধনী, ২০২৫-এ সিগনিফিক্যান্ট লোয়েস্ট টেন্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ছিল। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর অনাকাঙ্ক্ষিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে।

তাই সিগনিফিক্যান্ট লোয়েস্ট টেন্ডার প্রয়োগের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, যৌক্তিকতা যাচাই ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এর অপব্যবহার রোধে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা থাকা জরুরি।

৪. সরবরাহকারী ও ক্রয়কারী—উভয় পক্ষের সমান জবাবদিহি ও ন্যায্যতা

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় জবাবদিহির বিষয়টি শুধু সরবরাহকারী বা ঠিকাদারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ক্রয়ব্যবস্থায় সরবরাহকারী ও ক্রয়কারী উভয় পক্ষের সুস্পষ্ট অধিকার, দায়িত্ব ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

সরবরাহকারীর অনিয়মের ক্ষেত্রে যেমন জরিমানা, বর্জন বা নিষেধাজ্ঞার বিধান রয়েছে, তেমনি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কারণে ক্রয়প্রক্রিয়া বা চুক্তি বাস্তবায়নে অযৌক্তিক বিলম্ব বা ক্ষতি হলে উপযুক্ত প্রতিকারের ব্যবস্থাও থাকা উচিত।

বিশেষ করে আমদানিনির্ভর ও বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক ক্রয়ের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন বা চুক্তি প্রদানে দীর্ঘ বিলম্বের ফলে মুদ্রার বিনিময় হার, প্রস্তুতকারকের মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও অর্থায়ন ব্যয় পরিবর্তিত হলে তার সম্পূর্ণ ঝুঁকি সরবরাহকারীর ওপর চাপানোর প্রবণতার সমাধান প্রয়োজন।

ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কারণে চুক্তি সম্পাদনের নোটিশ বা চুক্তি প্রদানে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে দরপত্রের বৈধতার মেয়াদ, মূল্য ও আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনে উপযুক্ত প্রতিকারের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রাখা প্রয়োজন।

শেষ কথা

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মোঃ আল আমিন ভূঁঞার বিশ্লেষণে সরকারি ক্রয়কে জনগণের অর্থের বিনিময়ে জনগণের জন্য পণ্য, কাজ ও সেবা সংগ্রহের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়েছে। তার মতে, এখানে দরদাতার রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা প্রশাসনিক প্রভাব নয়—যোগ্যতা, কারিগরি সক্ষমতা, মূল্য, সেবার মান এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতাই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত।

একটি সংশোধনী তখনই প্রকৃত অর্থে সংস্কার হিসেবে কার্যকর হবে, যখন তা প্রতিযোগিতা বাড়াবে, কিন্তু প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বাড়াবে না; সিদ্ধান্ত গ্রহণে নমনীয়তা দেবে, কিন্তু স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ তৈরি করবে না; এবং বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তার বিপরীতে শক্তিশালী স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরীক্ষাযোগ্যতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।

শেষ পর্যন্ত সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার প্রতিটি প্রয়োগ হবে যুক্তিসংগত, নথিবদ্ধ, যাচাইযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.