জলবায়ু পরিবর্তন, তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কম চাহিদায় বড় সংকটে পড়েছে ফ্রান্সের ওয়াইন শিল্প। দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ওয়াইন উৎপাদন প্রায় ৭০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যেতে পারে। টানা তৃতীয় বছরের মতো উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সের বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ওয়াইন অঞ্চল বারগান্ডিতেও এ পরিস্থিতির প্রভাব স্পষ্ট বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি। সেখানকার গ্রঁ ক্রু আঙুর বাগানের বৃহত্তম মালিকানাকারী প্রতিষ্ঠান মেজোঁ লুই লাতুরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফ্লোরাঁ লাতুর বলেন, গ্রীষ্মজুড়ে তারা বৃষ্টির অপেক্ষায় ছিলেন। পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে এবারের ফলন ও মান—দুটিই ভালো হতে পারত। শেষ পর্যন্ত মান ধরে রাখা গেলেও স্বাভাবিক ফলনের প্রায় অর্ধেক পাওয়া গেছে।
আইএনএসইইসি গ্র্যান্ড একোল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইন ও স্পিরিটস বিভাগের প্রধান জ্যঁ-মারি কারদেবা বলেন, ২০২৩ সালের ফলন মোটামুটি ভালো হলেও চলতি দশকের শুরু থেকে উৎপাদনের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। তার মতে, এখন ফ্রান্সের কোনো ওয়াইন অঞ্চলই তাপপ্রবাহের ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

তুলনামূলকভাবে বেশি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল লোয়ার উপত্যকা ও শ্যাম্পেনেই এবার ক্ষতির মাত্রা বেশি। অন্যদিকে বোর্দো ও ল্যাঙ্গদক-রুসিয়োঁ অঞ্চলের উৎপাদকরা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি ফলনের কথা জানিয়েছেন।
কারদেবার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ফ্রান্সের প্রস্তুতির ঘাটতি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার উদাহরণ হিসেবে তিনি স্পেনের কথা উল্লেখ করেন। স্পেনে তাপপ্রবাহ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব বেশি হলেও সেখানে সেচব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে উন্নত।
ফ্রান্সে আঙুর বাগানে সেচের অনুমতি খুব সীমিত এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে তা দেওয়া হয়। ফলে নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে সময় লাগে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এ সীমাবদ্ধতাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
এদিকে তাপমাত্রা বাড়ার কারণে ফ্রান্সে আঙুর সংগ্রহের মৌসুমও আগের তুলনায় দ্রুত শুরু হচ্ছে। লাতুর জানান, চলতি বছর তাদের আঙুর সংগ্রহ শুরু হয়েছে ১৪ আগস্টে, যা প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে সবচেয়ে আগের সময়।
তার হিসাবে, প্রতি দশকে আঙুর সংগ্রহের মাঝামাঝি সময় প্রায় তিন দিন করে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৩০-এর দশকের তুলনায় এখন এই সময় প্রায় এক মাস এগিয়ে এসেছে।

এর ফলে উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। কখন শ্রমিক ও সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে নামতে হবে, তা অনেক সময় অল্প সময়ের মধ্যে ঠিক করতে হচ্ছে। পূর্বাভাস ভুল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এছাড়াও উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু ওয়াইন শিল্পেই নয়, ফ্রান্সের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। কারদেবাতের মতে, উৎপাদন কমে গেলে ফ্রান্স বিশ্বে ওয়াইন উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে নেমে যেতে পারে। একসময় ইতালির পরে ফ্রান্সই শীর্ষে ছিল। এখন ইতালি এগিয়ে আছে এবং স্পেনও ফ্রান্সকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তার মতে, এই পরিবর্তন শুধু প্রতীকী নয়; এর সঙ্গে ফ্রান্স ও ওয়াইন ব্যবসার বিপুল সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতিও জড়িত।
এরই মধ্যে ফরাসি সরকার ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। সরকারের হিসাবে, চলতি বছরের তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমতে পারে।
ওয়াইন উৎপাদকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করছে বাড়তে থাকা উৎপাদন ব্যয়। কারদেবাত বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠানের হাতে নগদ অর্থ কমে যাচ্ছে। জলবায়ু যত বেশি অস্থির হচ্ছে, বিনিয়োগের সক্ষমতা তত কমছে; অথচ অভিযোজনের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজনই এখন বেশি।
তার হিসাবে, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ওয়াইন খাতে ব্যবসা বন্ধের ঘটনা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ২০২৬ সালেও পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
জলবায়ু সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে ওয়াইনের কমে যাওয়া চাহিদা। ফ্রান্সে নিয়মিত ওয়াইন পানকারী মানুষের হার ১৯৬০ সালে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে ২০১৮ সালে ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
গত পাঁচ বছরে মূল্যস্ফীতি ও শুল্কের চাপও বাজারে ওয়াইনের মজুত বাড়িয়েছে। এ কারণে অনেক উৎপাদক আঙুরের গাছ তুলে উৎপাদন কমানোর পথে হাঁটছেন।
শুধু বোর্দো অঞ্চলেই ২০২৩ সাল থেকে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর আঙুর বাগান তুলে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে অবশিষ্ট বাগানের আয়তন প্রায় ৮৩ হাজার হেক্টর।
২০২৬ সালে সরকারি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ফ্রান্সের মোট আঙুর বাগানের প্রায় ৪ শতাংশ তুলে ফেলা হতে পারে। স্থায়ীভাবে গাছ তুলে ফেলতে প্রতি হেক্টরে ৪ হাজার ইউরো করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে সংকট মোকাবিলায় ওয়াইন উৎপাদকরা নতুন বাজার, নতুন ধরনের পণ্য এবং ভোক্তাদের নতুন প্রজন্মকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারদেবাতের মতে, নতুন ধরনের প্যাকেজিং ও প্রস্তুত অবস্থায় পানযোগ্য ওয়াইনের মতো ভিন্ন পণ্য বাজারে আনার সুযোগ রয়েছে।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন পণ্য পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে উল্লেখ করেন। দক্ষিণ আমেরিকা, ব্রাজিল ও ভারতকেও ফরাসি ওয়াইনের সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মেজোঁ লুই লাতুরের প্রধান নির্বাহী ফ্লোরাঁ লাতুরের মতে, নতুন প্রজন্মকে ওয়াইনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী দামে ভালো মানের পণ্য পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ আমেরিকা, ব্রাজিল ও আফ্রিকাতেও তাদের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে।
তীব্র সংকটের মধ্যেও ফরাসি ওয়াইন শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী লাতুর। তার মতে, ওয়াইনের ইতিহাস, উৎপাদন অঞ্চল ও গুণগত মান সহজ ভাষায় নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারলে ভোক্তাদের আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.