সিসিপি চালু না হওয়ায় পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন: এনএলআই সিকিউরিটিজের সিইও

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলমান অস্থিরতা ও পতনের ধারা থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর বাজার অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এনএলআই সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা: শাহেদ ইমরান। তার মতে, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারে কেন্দ্রীয় কাউন্টার পার্টি বা সিসিপির কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বাজারে তারল্য বাড়াতে মার্কেট মেকার ব্যবস্থাও কার্যকর করা প্রয়োজন।

এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় তিনি বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীরা বারবার বাজারে এসে লোকসানের মুখে পড়ছেন। বাজারের এই ধারাবাহিক পতনের কারণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা মত থাকলেও সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।

মুহা: শাহেদ ইমরানের মতে, বাজারের পতন ঠেকাতে বা এর গতি কমিয়ে আনতে কার্যকর সাপোর্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবির ওপর নির্ভর করা বাস্তবসম্মত নয়। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা এবং দেশের পুঁজিবাজারের ব্যাপ্তি বিবেচনায় বাজারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার মতো সক্ষমতা আইসিবির একার নেই।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, সাত দশকের বেশি সময় পার করা দেশের পুঁজিবাজারে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী এবং দুটি স্টক এক্সচেঞ্জে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের লেনদেন হলেও বাজারের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কতটা কার্যকর হয়েছে।

তার মতে, আধুনিক পুঁজিবাজারে লেনদেনের ঝুঁকি কমানো এবং বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় কাউন্টার পার্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে সিসিপি ও মার্কেট মেকার—দুটি ব্যবস্থার কথাই দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও সিসিপির কার্যকর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

মুহা: শাহেদ ইমরান বলেন, প্রায় এক দশক আগে থেকেই দেশে সিসিপি চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। কয়েক বছর আগে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সিসিপি কার্যক্রম শুরু করলেও এর কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের বাইরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কতটা দৃশ্যমান—তা নিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

এ কারণে তিনি প্রশ্ন রাখেন, প্রায় এক দশক ধরে আলোচনা ও উদ্যোগের পরও পুঁজিবাজারে সাপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে সিসিপি কেন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না এবং এর দায়ভারই বা কে নেবে।

যেভাবে কাজ করে সিসিপি

সিসিপি মূলত ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যবর্তী পক্ষ হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে লেনদেনের পর কোনো পক্ষ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সেই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি থাকে।

সিসিপির গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে লেনদেনের ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট নিশ্চিত করা, বাজারসংশ্লিষ্ট সদস্যদের কাছ থেকে মার্জিন সংগ্রহ এবং কোনো সদস্য লেনদেনের দায় পূরণে ব্যর্থ হলে তা মোকাবিলার জন্য বিশেষ তহবিল রাখা।

এর ফলে কোনো একটি সদস্যের ব্যর্থতার প্রভাব যাতে পুরো বাজারে ছড়িয়ে না পড়ে, সে ব্যবস্থাও নেওয়া যায়। শাহেদ ইমরানের মতে, পুঁজিবাজারকে ঝুঁকি-সহনশীল ও সুশৃঙ্খল রাখতে এ ধরনের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারল্য বাড়াতে মার্কেট মেকার

পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গে মার্কেট মেকারের ভূমিকাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন তিনি। মার্কেট মেকারের প্রধান দায়িত্ব হলো নির্দিষ্ট শেয়ারে নিয়মিত ক্রয় ও বিক্রয়ের দর দেওয়া, যাতে বাজারে তারল্য বজায় থাকে এবং হঠাৎ ক্রেতা বা বিক্রেতার সংকট তৈরি না হয়।

উদাহরণ হিসেবে একটি শেয়ারে ৯৯ টাকা ক্রয় দর এবং ১০১ টাকা বিক্রয় দর দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। এতে বিক্রেতা বাজারে একজন সম্ভাব্য ক্রেতা এবং ক্রেতা একজন সম্ভাব্য বিক্রেতা খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পান।

তার মতে, নিয়মিত ক্রয়-বিক্রয় দর থাকলে ক্রয় ও বিক্রয় দরের ব্যবধান কমতে পারে এবং কোনো শেয়ারে হঠাৎ ক্রেতা-বিক্রেতা না থাকার সমস্যাও কিছুটা কমে আসে।

তবে মার্কেট মেকারের কাজ শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো বা কমানো নয়। নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে থেকে বাজারে তারল্য ও সুশৃঙ্খল লেনদেন নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

দোষারোপের চক্র থেকে বের হওয়ার তাগিদ

শাহেদ ইমরানের মতে, বাজারে একবার পতন শুরু হলে তা ধীরে ধীরে একটি পতনের চক্রে পরিণত হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়, তারল্য সংকট তৈরি হয় এবং বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ের ভারসাম্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

তিনি অভিযোগ করেন, বাজারের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি শেয়ারের দর বাড়িয়ে বা কমিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির মুখে ফেলছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুঁজিবাজার নিয়ে অনাস্থা আরও বাড়ছে।

তার মতে, সিসিপির কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া মার্কেট মেকার ব্যবস্থাকেও পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন। তাই শুধু একে অপরকে দোষারোপ না করে বাজারের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কার্যকর করার দিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া উচিত।

সবশেষে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের এই ব্যর্থতার কারণে সাধারণ মানুষকে পুঁজিবাজারবিমুখ করে তোলা হচ্ছে। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না গেলে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। পুঁজিবাজারের বর্তমান দুরবস্থার দায় কোনো একক পক্ষের নয়; এর দায় বাজারসংশ্লিষ্ট সবার।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.