মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে হামলা ও জ্বালানি পরিবহন অবকাঠামোয় বিঘ্নের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়েছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ থাকা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং বাব আল-মান্দেব ঘিরে হুথিদের তৎপরতা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেনের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ৯০ ডলার বা ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ১০৭ দশমিক ৫১ ডলারে ওঠে। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ২ দশমিক ২৭ ডলার বা ২ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৩২ ডলারে দাঁড়ায়। দিনের শুরুতে উভয় বেঞ্চমার্কের দামই ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
গত এক সপ্তাহে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। এর আগে জুলাইয়ের পর প্রথমবারের মতো দুই বেঞ্চমার্কের দাম ১০০ ডলারের ঘর অতিক্রম করে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় তেলবাজারে সরবরাহের বিকল্প পথগুলোও ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে সৌদি আরবের প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন। পারস্য উপসাগর থেকে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহনের এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ইরাক থেকে পরিচালিত ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যায়। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে এই পাইপলাইন দিয়ে দিনে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব, যা বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশের সমান। ফলে পাইপলাইনটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ ঘাটতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে বর্তমানে যে পরিমাণ তেল মজুত রয়েছে, তা দিয়ে পাইপলাইন বন্ধ থাকা অবস্থায় মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পাইপলাইন মেরামতে কয়েক দিন থেকে পাঁচ-ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রের ধারণা রয়েছে।
একই সময়ে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও স্বাভাবিক নয়। রোববার প্রণালিটি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজের চলাচল ১০ দিনের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। সপ্তাহান্তে মাত্র চারটি জাহাজ উপসাগর থেকে বের হয়েছে এবং ১০টি জাহাজ প্রবেশ করেছে। যদিও কিছু জাহাজ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করে থাকতে পারে।
সম্প্রতি হরমুজ দিয়ে চলাচলের সময় একটি বাণিজ্যিক জাহাজ অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলাবস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, পরে জাহাজটির নাবিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়। ইরানও জানিয়েছে, দেশটির উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় একজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত এবং বিশ্বের দৈনিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি ব্যয়ের ওপরও পড়বে।
হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ইয়েমেনের হুথিরা কৌশলগত পেরিম দ্বীপে অবস্থান নেওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সৌদি জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকিও দিয়েছে গোষ্ঠীটি।
ফলে তেলবাহী জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘপথ ব্যবহার করতে হলে পরিবহন সময় ও খরচ উভয়ই বেড়ে যায়। আফ্রিকা ঘুরে এশিয়ার বাজারে পৌঁছাতে অতিরিক্ত প্রায় ২২ দিন সময় লাগতে পারে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। এর সঙ্গে জাহাজভাড়া, জ্বালানি ও বিমা ব্যয় বাড়ায় সরবরাহ ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে সৌদি আরবের তেল উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশটির অপরিশোধিত তেল সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে, যা তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির উৎপাদন ছিল প্রায় ১ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল।
এদিকে চলতি বছরে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৬ শতাংশ কমতে পারে বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বজুড়ে তেলের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে স্থায়ী হলে এর প্রভাব জ্বালানি থেকে শুরু করে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প উৎপাদন ও ভোগ্যপণ্যের দামে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেল, পেট্রোল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দামও ইতোমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে।
জ্বালানি ব্যয় বাড়লে বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিবর্তে মুদ্রানীতি আরও কঠোর রাখার চাপে পড়তে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণেও তেলের বাড়তি দামের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হয়েছে। ফলে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দ্রুত চালু না হলে এবং হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। আইজি মার্কেটের বিশ্লেষক টনি সাইকামোরের মতে, পরিস্থিতির অবনতি হলে তেলের দাম গত মার্চের সর্বোচ্চ ১১৯ দশমিক ৪৮ ডলারের কাছাকাছি চলে যেতে পারে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারের তেল মজুত ও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে, ফলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাজারের কমে যেতে পারে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.