হুথিদের ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পাইপলাইনটি চালু করা না গেলে লোহিত সাগর হয়ে রপ্তানির জন্য সৌদি আরবের হাতে থাকা তেলের মজুত ফুরিয়ে যেতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে দৈনিক তেল সরবরাহে প্রায় ৪ শতাংশ ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক তেল ব্যবসায়ীরা।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, সৌদি আরব থেকে জ্বালানি সরবরাহ আরও কমে গেলে বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে। এরই মধ্যে সংকটের প্রভাবে জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং মার্কিন বন্ডের সুদের হার ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শুক্রবার ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব তাদের অন্যতম প্রধান পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে হামলায় পাইপলাইনটির কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং এটি কতদিন বন্ধ থাকতে পারে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি রিয়াদ।
রয়টার্সকে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নিয়ে তাদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। একটি সূত্রের দাবি, পাইপলাইন মেরামতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। অন্য একটি সূত্র বলেছে, মেরামত তুলনামূলক দ্রুত শেষ করা সম্ভব এবং কাজ চলার সময় সীমিত পরিসরে তেল পাম্পিংও চালু করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে সৌদি আরবের সরকারি তথ্য দপ্তর ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আরব উপদ্বীপের মরুভূমির মধ্য দিয়ে যাওয়া এই পাইপলাইন গত ছয় মাসে সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রপ্তানি পথ হিসেবে কাজ করেছে। হরমুজ প্রণালি যুদ্ধের কারণে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হলেও এই পাইপলাইন ব্যবহার করে সৌদি আরব লোহিত সাগর দিয়ে সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পেরেছিল।
পাইপলাইনটির মাধ্যমে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরব প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাতে পারে। এই পরিমাণ বিশ্বব্যাপী দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ। বর্তমানে পাইপলাইন বন্ধ থাকায় ইয়ানবু বন্দরে থাকা মজুত দিয়ে মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি চালু রাখা সম্ভব বলে সৌদি তেল রপ্তানি সম্পর্কে অবহিত তিনটি শিল্প সূত্র জানিয়েছে।
তবে মিসরের আইন সুখনা ও ভূমধ্যসাগরের সিদি কেরির বন্দর ব্যবহার করে আরও কয়েক দিন গ্রাহকদের তেল সরবরাহ করার মতো সীমিত মজুত সৌদি আরবের রয়েছে বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র। শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, ইয়ানবু বন্দরে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। আইন সুখনা ও সিদি কেরির বন্দরের ধারণক্ষমতা যথাক্রমে ১ কোটি ৮০ লাখ ও ২ কোটি ব্যারেল।
তবে এসব মজুতকেন্দ্র পুরোপুরি পূর্ণ নয়। ফলে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন দ্রুত চালু করা সম্ভব না হলে পর্যায়ক্রমে বিকল্প বন্দরগুলোর মজুতও শেষ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে তেল পরিবহন কমে যাওয়ায় গত আগস্টে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস, চলতি বছর বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ প্রতিদিন ৫৭ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৬ শতাংশ কমতে পারে।
এর মধ্যে সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলার হুমকিও দিয়েছে ইয়েমেনের হুথিরা। শুক্রবার তারা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে একটি দ্বীপ দখল করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল প্রবাহ কমে দৈনিক ৬০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে একাধিক শিল্প সূত্র।
সৌদি আরব গত সপ্তাহে ওপেককে জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল। তবে আগস্টে তা ব্যাপকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬২ লাখ ব্যারেলে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.