‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে ইয়েমেনের হুতিরা

ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার কয়েক মাস পর এবার লোহিত সাগরের একটি কৌশলগত দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা। এর মাধ্যমে তারা ইউরোপ ও এশিয়াকে যুক্তকারী একটি অত্যাবশ্যকীয় শিপিং করিডোর ‘বাব আল-মানদেব’-এর ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চূড়ান্ত করল।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ইয়েমেনি মিত্রদের এই অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানায় ইরান, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। এক সপ্তাহব্যাপী সশস্ত্র অভিযানের পর ইয়েমেনের দিকে বাব আল-মানদেব প্রণালির তীরের ভূখণ্ড হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। প্রণালিটি লোহিত সাগর এবং পরবর্তীতে সুয়েজ খালের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে।

ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারের একজন স্থানীয় কর্মকর্তা আজ নিশ্চিত করেছেন যে, হুতিরা বাব আল-মানদেব এলাকা এবং মাইয়ুন দ্বীপের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে, এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, বন্দুকধারীরা বাব আল-মানদেব উপকূল জুড়ে অবস্থান নিচ্ছে এবং সামরিক যানবাহনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সংকীর্ণ এই জলপথের মাঝখানে অবস্থিত মাইয়ুন দ্বীপ দখলের ফলে সৌদি আরবভিত্তিক তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা হুতি বিদ্রোহীদের অনেক বেড়ে গেল, যাকে তারা জুলাই থেকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আসছিল।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভরশীলতা হারিয়ে লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল, কারণ ইরানের হরমুজ অবরোধের পর থেকে উপসাগরীয় রুটে তাদের রপ্তানি বন্ধ ছিল।

শুক্রবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে হুতিদের পলিটব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ বৈশ্বিক নৌ-পরিবহন নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করে জোর দিয়ে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।’ আল-আরাবি আল-জাদিদ সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘লোহিত সাগর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রয়েছে।’

জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা শুক্রবার জানিয়েছে, হুতিদের এই অভিযানে ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রায় ৪৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের মাধ্যমে শুরু হওয়া ইয়েমেনের নৃশংস গৃহযুদ্ধের নতুন সংস্করণের অংশ হলো এই সাম্প্রতিক হামলা।

চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের উত্তরের প্রতিবেশী সৌদি আরবের ওপর বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুতিরা, যার ফলে তেলের স্থাপনাগুলোতে আগুন ধরে যায় এবং ৭৩ জন আহত হন।

লোহিত সাগরে হামলা চালানোর আগেই ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের একটি বড় অংশ হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সম্প্রতি তারা হোদেইদা ও তাইজ প্রদেশে সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে হামলা চালিয়ে উপকূলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে এবং বৃহস্পতিবার বাব আল-মানদেবের উত্তরে অবস্থিত কৌশলগত বন্দর নগরী মোচা এবং জুকার দ্বীপ দখল করে নেয়। সৌদি আরব বিমান হামলা চালিয়ে এর জবাব দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারভিত্তিক এডেন থেকে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর নির্দেশ দিলেও, তারা হুতিদের এই দ্রুত অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।

হুতি বার্তা মাধ্যম জানিয়েছে, শুক্রবার মোচা বিমানবন্দরে দুটি সৌদি বিমান হামলা চালানো হয়। অপরদিকে একজন স্থানীয় কর্মকর্তা জানান, অজানা উৎস থেকে আসা ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র শহরের সমুদ্রবন্দরেও আঘাত হেনেছে।

ইয়েমেনের স্থানীয় একজন কর্মকর্তা জানান, মাত্র ১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের মাইয়ুন দ্বীপে হুতি যোদ্ধার সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে তারা সম্ভবত বাব আল-মানদেবের ওপর নজর রাখা পাহাড়গুলোতে মোতায়েন হবে। এই প্রণালিতে চারটি কৌশলগত দ্বীপ রয়েছে- জুকার ও মাইয়ুন নামের দুটিই বর্তমানে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া রয়েছে হানিশের দুটি দ্বীপ।

সরকারি সামরিক সূত্রগুলো এএফপি-কে জানিয়েছে, হুতিরা এখন হানিশ দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত সরকারি সেনাদের ঘিরে রেখেছে।

চলমান এই সহিংসতা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে নতুন করে উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা আগে হাজারো মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল এবং বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকট তৈরি করেছিল।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.