চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের নামে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আলোচনায় আসা ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম আবারও সামনে আসা বর্তমান সরকারের জন্য লজ্জার বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দেওয়া হলেও বন্দরের আধিপত্য দখলে সেই পুরোনো শক্তিই ফিরে এসেছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটি (এমসিআরএস) আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতা নাই’—এই যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের সঙ্গে গত ৫৪ বছর ধরে প্রতারণা করা হয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়া এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিলে রাষ্ট্র হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এ সময় রূপপুর ও মাতারবাড়ীর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব অতি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তার উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই।
মূল প্রবন্ধে যা বলা হয়েছে
গোলটেবিল আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক আমার দেশ-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান সোহাগ কুমার বিশ্বাস। প্রবন্ধে বলা হয়, আলোচনাটি শুধু ‘দেশি না বিদেশি’ প্রশ্নে আটকে থাকলে মূল হিসাব আড়ালে পড়ে যায়।
প্রবন্ধে দাবি করা হয়, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত। এতে সরকারি বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন ও ৩৩টি আরটিজি যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম বা টিওএসও সচল রয়েছে।
প্রবন্ধ অনুযায়ী, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। এটি জার্মান পরামর্শকের নির্ধারিত ১১ লাখ টিইইউ সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। ২০২৬ সালের মে মাসে এক মাসেই এনসিটি রেকর্ড ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউ হ্যান্ডলিং করেছে বলেও প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
প্রস্তাবিত কাঠামোর তিনটি পরিবর্তনের দিকেও প্রবন্ধে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। প্রথমত, দায়িত্বের ধরন। শুরুতে ‘অপারেটর’ এবং পরে ‘কনসেশনিয়ার’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে মাশুলের অর্থ সরাসরি বন্দরের হিসাবে জমা হবে না বলে প্রবন্ধে দাবি করা হয়।
দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট পার-টিইইউ রাজস্বের পরিবর্তে স্তরভিত্তিক রয়্যালটির প্রস্তাব রয়েছে। এতে ‘গড় আয়’ কত দেখানো হবে, তার ওপর বন্দরের প্রাপ্তির হার নির্ভর করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, চুক্তির মেয়াদ। ১৫ বছরের আর্থিক মডেলে হিসাব প্রস্তুত করা হলেও বর্তমানে মেয়াদ ৩০ বছর করার দাবি রয়েছে বলে প্রবন্ধে বলা হয়।
ধারণাপত্রের কয়েকটি সংখ্যা
প্রবন্ধে উপস্থাপিত ধারণাপত্র অনুযায়ী, প্রতি কনটেইনারে বন্দরের নিট প্রাপ্তি ৬৫ দশমিক ২৫ ডলার থেকে কমে ১৭ দশমিক ১৮ ডলারে নেমে আসতে পারে। একই ১২০ ডলার আয়ের ভিত্তিতে এটি প্রায় ৭৪ শতাংশ কম বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রতি কনটেইনারে ৪৮ দশমিক ০৭ ডলারের এই পার্থক্যের ফলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা, ১৫ বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ৩০ বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার পার্থক্য হতে পারে বলে ধারণাপত্রে হিসাব দেওয়া হয়েছে।
এর বিপরীতে প্রস্তাবিত বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ২০৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিনিয়োগটি কোন কোন খাতে করা হবে, তা অনির্দিষ্ট বলে প্রবন্ধে দাবি করা হয়।
দেশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে প্রতিটি রাজস্ব-ধাপে ৫ ডলার বেশি এবং অগ্রিম ফি ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে প্রতি টিইইউতে ৯৮ দশমিক ৫০ ডলার পাওয়া যাবে, যা বিদেশি প্রস্তাবের সর্বোচ্চ সীমা ৯৭ দশমিক ৫০ ডলারের চেয়েও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, দর-কষাকষির সময় ন্যূনতম কনসেশন ফি ৯৯ দশমিক ৫৪ ডলার থেকে কমিয়ে ৯৪ দশমিক ৯৬ ডলার করা হয়েছে। শুধু এই সমন্বয়ের কারণেই বছরে প্রায় ৬৩ লাখ ডলার ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে ধারণাপত্রে হিসাব করা হয়েছে।
এতে আরও দাবি করা হয়, আদালত কেবল প্রক্রিয়ার বৈধতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন; চুক্তির শর্তাবলি পরীক্ষা করেননি। কারণ চুক্তির শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
প্রবন্ধে বলা হয়, আধুনিক টার্মিনালের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু ক্রেন নয়, তথ্যও। কার্গো ম্যানিফেস্ট, শিপার ও কনসাইনি তথ্য, রপ্তানি প্রবাহ এবং বার্থিং সূচির নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ চিত্রও তার হাতে থাকবে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে আলোচ্য বৈশ্বিক অপারেটরের অস্ট্রেলিয়া কার্যক্রমে সাইবার হামলার কারণে চারটি বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং ৩০ হাজারের বেশি কনটেইনার আটকে পড়েছিল বলেও প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়।
একই অপারেটর এনসিটি ও সিসিটি—দুটি প্রধান টার্মিনাল পরিচালনা করলে মাশুল ও বার্থিং অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের বিকল্প কমে যেতে পারে বলেও প্রবন্ধে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
এমসিআরএসের সাত দফা প্রস্তাব
গোলটেবিলে এমসিআরএসের পক্ষ থেকে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, এগুলো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে নয়; দেশি বা বিদেশি—যেকোনো অপারেটরের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
এক. প্রক্রিয়া: কৌশলগত জাতীয় অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি হস্তান্তর কেবল উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে করতে হবে। অযাচিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরাসরি আলোচনা করা যাবে না।
দুই. বাধ্যতামূলক যৌথ উদ্যোগ: কৌশলগত অবকাঠামোয় বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশীয় কোম্পানির ন্যূনতম ৫১ শতাংশ মালিকানা এবং বিদেশি অংশীদারের সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ মালিকানা থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিন. মেয়াদ ও পরিধি: চুক্তির মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ বছর হতে হবে এবং তা প্রকৃত বিনিয়োগ ও পরিশোধকালের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। একই অপারেটরকে একই বন্দরে একাধিক কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ না দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
চার. মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ: ৫১/৪৯ মালিকানা কাঠামো কাগজে-কলমে নয়, কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শেয়ার, লভ্যাংশের অধিকার ও পর্ষদের ভোটাধিকার—তিন ক্ষেত্রেই দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।
পাঁচ. তথ্য ও কৌশলগত সুরক্ষা: টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম ও সব পরিচালন তথ্যের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে রাখতে হবে। তথ্য দেশের ভেতরে সংরক্ষণ, স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ ও নজরদারি অবকাঠামোর স্পষ্ট সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ছয়. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এর খসড়া শর্তাবলি প্রকাশ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন করতে হবে। স্থানীয় এজেন্ট, অংশীদার ও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তালিকাও প্রকাশের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সাত. শ্রমিক ও দেশীয় শিল্প: বিদ্যমান জনবলের চাকরি ও সেবাশর্ত সুরক্ষার পাশাপাশি দেশীয় বার্থ অপারেটর ও সেবাদাতাদের শুধু সাবকন্ট্রাক্টর না বানিয়ে অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দেশীয় পতাকাবাহী ও ফিডার জাহাজের ক্ষেত্রে বার্থিংয়ে বৈষম্য না করার নিশ্চয়তাও চাওয়া হয়েছে।
এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটির শীর্ষ নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে তুলে দিলে শ্রমিকদের আন্দোলন সামাল দেওয়া কঠিন হবে। শ্রমিকদের বিশ্বাস, ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে লিজ দেওয়ার অর্থ বন্দরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সব ধরনের অধিকার হরণ করা।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক বাতেন বিপ্লব। আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন মাওলানা ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. হারুন অর রশিদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফি রতন, গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সত্যজিৎ বিশ্বাস, ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি সায়েদুল হক নিশান, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর প্রেসিডেন্ট দিলীপ রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা রিতু ও নাগরিক ঐক্যের সাংগঠনিক সম্পাদক সাকিব আনোয়ারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বক্তারা বলেন, প্রশ্নটি ‘দেশি না বিদেশি’—এটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো কোন শর্তে, কত বছরের জন্য, কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং শেষ পর্যন্ত কারা লাভবান হবে। একটি ভুল দরপত্র বাতিল করা বা ভুল বিনিয়োগ পুনর্গঠন করা সম্ভব হলেও ৩০ বছরের আন্তর্জাতিক কনসেশন চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সালিসি আদালতে দীর্ঘ সময় ধরে আইনি লড়াই করতে হতে পারে। তাই তাড়াহুড়ো না করে আগে প্রশ্নগুলোর উত্তর নিশ্চিত করে পরে চুক্তি স্বাক্ষরের আহ্বান জানান তারা।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.