মার্কিন বন্ডবাজারে অস্থিরতা, সুযোগ দেখছেন অভিজ্ঞ ট্রেডাররা

যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজারে গত সপ্তাহজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তায় সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড দ্রুত বেড়েছে। তবে এই অস্থিরতার মধ্যেই কিছু ট্রেডার ও বিনিয়োগকারী বন্ড কেনার সুযোগ খুঁজছেন।

বন্ডের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইয়েল্ড ও দামের সম্পর্ক বিপরীত। অর্থাৎ ইয়েল্ড বাড়লে সাধারণত বন্ডের দাম কমে। ফলে সাম্প্রতিক ইয়েল্ড বৃদ্ধির কারণে পুরোনো বন্ডের দাম কমেছে, যা কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে তুলনামূলক কম দামে বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করেছে।

বাজারের সবচেয়ে বেশি নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে। গত সপ্তাহে এর ইয়েল্ড ৪ দশমিক ৮ শতাংশের ওপরে উঠে যায়, যা ২০২৩ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। ৮ সেপ্টেম্বরও ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারির ইয়েল্ড প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশে ছিল।

ট্রেডারদের একটি অংশ মনে করছেন, ইয়েল্ড আরও বাড়লে বন্ডের দাম আরও আকর্ষণীয় পর্যায়ে নামতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা ধাপে ধাপে ট্রেজারি বন্ড কেনার সুযোগ খুঁজছেন।

তবে একবারে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের পরিবর্তে ধীরে ধীরে বিনিয়োগ করার কৌশলকেই তুলনামূলক নিরাপদ মনে করা হচ্ছে। কারণ মূল্যস্ফীতি ও সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো রয়েছে।

এদিকে বন্ডবাজারের অস্থিরতার পেছনে ফেডের সুদহার নিয়ে পরিবর্তিত প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থান প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী হওয়ার পর বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে, ফেড হয়তো সুদহার বাড়াতে পারে। বর্তমানে সেপ্টেম্বরের বৈঠকে ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদহার বাড়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬০ শতাংশ হিসেবে দেখছে বাজার।

সুদহার বাড়লে সাধারণত নতুন বন্ডে বেশি রিটার্ন পাওয়া যায়। ফলে পুরোনো বন্ডের আকর্ষণ কমে এবং সেগুলোর দামও কমে যেতে পারে। এ কারণেই বিনিয়োগকারীরা ফেডের সিদ্ধান্তের দিকে গভীর নজর রাখছেন।

অন্যদিকে সব বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারিতে যেতে চাইছেন না। মূল্যস্ফীতি ও সুদহার বাড়ার ঝুঁকি সামলাতে অনেকে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি ও মূল্যস্ফীতি-সুরক্ষিত বন্ডের দিকে ঝুঁকছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে বন্ডভিত্তিক ফান্ডে অর্থপ্রবাহও শক্তিশালী রয়েছে। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি ও ট্রেজারি ইনফ্লেশন-প্রটেক্টেড সিকিউরিটিজ বা টিআইপিএসের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, বিনিয়োগকারীরা উচ্চ ইয়েল্ডের সুবিধা নিতে চাইছেন, কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সুদহার ঝুঁকি এড়িয়ে চলছেন।

বন্ডবাজারের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সরকারি ঋণ কে কিনবে? দেশটির সরকারি ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে বিশ্বের বড় কিছু বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ট্রেজারি কেনার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সরকারি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা বেশি রিটার্ন বা ইয়েল্ড দাবি করলে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্ড ইয়েল্ড বৃদ্ধির পেছনে মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ ও বাড়তি ঋণ ইস্যুর চাপ গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বন্ডবাজারের এই পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড বাড়লে বিশ্ববাজারে ডলারের সম্পদের আকর্ষণ বাড়তে পারে। এতে উদীয়মান বাজার থেকে কিছু বিনিয়োগ বেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদে যেতে পারে।

অন্যদিকে উচ্চ সুদহারে নতুন করে বন্ডে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে ভালো রিটার্ন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সংকট হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবেও দেখছেন।

সব মিলিয়ে, বন্ডবাজারে এখন মূল প্রশ্ন হলো—ইয়েল্ড আর কতটা বাড়বে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে এবং ফেড ভবিষ্যতে সুদহার কমানোর পথে গেলে বর্তমান উচ্চ ইয়েল্ডে কেনা বন্ড থেকে মূলধনী লাভের পাশাপাশি সুদ আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তার আগে ফেডের নীতি, মূল্যস্ফীতি, তেলের দাম ও সরকারি ঋণের গতিপথের দিকে নজর রাখাই হবে বিনিয়োগকারীদের প্রধান কাজ।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.