জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির ঐতিহাসিক জয়, ইউরোপে কট্টর ডানপন্থার নতুন বার্তা

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)–এর ঐতিহাসিক জয় ইউরোপের রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দলটি ৪৩.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছে। তবে ৮৩ আসনের রাজ্য পার্লামেন্টে ৩৯টি আসন পাওয়ায় এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৪২ আসন থেকে তিনটি আসন পিছিয়ে রয়েছে।

চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) পেয়েছে মাত্র ১৭.২ শতাংশ ভোট ও ১৫টি আসন। ফলে শুধু স্যাক্সনি-আনহাল্ট নয়, এ ফল মের্ৎসের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

এএফডি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এখন মূল প্রশ্ন—দলটি সরকার গঠন করতে পারবে কি না। জার্মানির মূলধারার দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এএফডির সঙ্গে জোট না করার নীতি অনুসরণ করছে, যা দেশটির রাজনীতিতে ‘ফায়ারওয়াল’ নামে পরিচিত। মের্ৎসও নির্বাচনের পর এ নীতি বজায় রাখার কথা জানিয়েছেন।

মের্ৎসের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা

স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল মের্ৎসের জন্য বিশেষভাবে অস্বস্তিকর। নির্বাচনের আগে তাঁর সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং এএফডির উত্থান ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ভোটের ফল দেখিয়েছে, বিশেষ করে পূর্ব জার্মানির ভোটারদের একটি বড় অংশ মূলধারার রাজনীতিতে আস্থা হারাচ্ছে।

এএফডির উত্থানের পেছনে অভিবাসন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। দলটি অভিবাসন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, ইউক্রেনকে সমর্থন কমানো এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো অবস্থান সামনে রেখেছে।

জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা স্যাক্সনি-আনহাল্ট শাখার এএফডিকে ‘নিশ্চিত ডানপন্থী উগ্রপন্থী সংগঠন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। দলটি অবশ্য এ ধরনের মূল্যায়নকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে।

শুধু জার্মানি নয়, ইউরোপেও ডানপন্থার উত্থান

স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলকে ইউরোপে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি উত্থানের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী ও অভিবাসনবিরোধী দলগুলো সমর্থন বাড়াচ্ছে।

তবে এ উত্থান সব দেশে একই গতিতে হচ্ছে না। কোথাও কট্টর ডানপন্থী দল সরকারে অংশ নিচ্ছে, কোথাও তারা প্রধান বিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। জার্মানির ক্ষেত্রে এখনো মূলধারার দলগুলোর ‘ফায়ারওয়াল’ তাদের সরাসরি সরকারে যাওয়ার পথে বড় বাধা।

কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল সেই রাজনৈতিক দেয়ালের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। কারণ এএফডি এখন এত বড় ভোট পেয়েছে যে তাকে বাদ দিয়ে স্থিতিশীল সরকার গঠন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নজর এখন ফ্রান্সে

জার্মানির এই ফলের পর স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপের রাজনৈতিক নজর পড়ছে ফ্রান্সের দিকে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‌্যালির নেতা মারিন লে পেন এখনো জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন।

৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ইপসোসের সর্বশেষ জরিপে বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রার্থীর পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রথম দফায় লে পেনের সমর্থন ৩৪ থেকে ৩৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে—যা তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থীদের সম্ভাব্য উত্থান জার্মানির তুলনায় আরও বড় রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই প্রধান শক্তি জার্মানি ও ফ্রান্সের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে গেলে ইউরোপের অভিবাসননীতি, ইউক্রেন নীতি, অর্থনৈতিক নীতি এবং ইউরোপীয় সংহতির ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে।

বদলে যাচ্ছে ইউরোপের রাজনৈতিক সমীকরণ

স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডির জয় তাই শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচন নয়; এটি ইউরোপের মূলধারার রাজনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তাও। অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন, নিরাপত্তা ও সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর জন্য আরও বড় রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হতে পারে।

তবে এএফডির এই জয়কে সরাসরি সরকার গঠনের সমান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জার্মানির রাজনৈতিক ‘ফায়ারওয়াল’ এখনো বহাল রয়েছে। কিন্তু ৪৩.৮ শতাংশ ভোট এবং ৩৯টি আসন নিয়ে এএফডি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে দলটিকে আর শুধু প্রান্তিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপেক্ষা করা কঠিন।

সামনের দিনগুলোতে স্যাক্সনি-আনহাল্টে সরকার গঠনের সমীকরণ এবং ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশের নির্বাচনী রাজনীতি তাই নজর কাড়বে। এসব ফল নির্ধারণ করবে—ইউরোপের রাজনীতি মধ্যপন্থায় থাকবে, নাকি আরও স্পষ্টভাবে ডানদিকে সরে যাবে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.