এআই কি আসলেই কেড়ে নেবে ডিজাইনারদের চাকরি? কি বলছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তারে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হলেও পেশাদার ডিজাইনারদের এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা ও মানুষের অনুভূতি বোঝার সক্ষমতার কারণে এআই পুরোপুরি মানব ডিজাইনারের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে না। বরং প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী বাদ দেওয়ার চেয়ে এআইকে তাঁদের কাজের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনাই বেশি।

যুক্তরাজ্যের ডিজাইন কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী ম্যাট হান্টারের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, প্রযুক্তির কারণে কাজের ধরন বদলানো নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে ডিজাইনাররা এআই ব্যবহার করে নিজেদের কাজের মূল্য আরও বাড়াতে পারবেন। তাঁর মতে, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে পেশাদার ডিজাইনারের প্রয়োজন বরং আরও বাড়বে।

ডিজাইন বিজনেস কাউন্সিলের প্রধান নির্বাহী ডেবোরা ডটনও মনে করেন, দক্ষ ডিজাইনারদের জন্য এআই সরাসরি হুমকি নয়। তাঁর মতে, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সহমর্মিতা এবং যে খাতে কাজ করা হচ্ছে সে সম্পর্কে গভীর জ্ঞান—এসব বিষয় একজন ভালো ডিজাইনারকে এআইয়ের চেয়ে আলাদা করে রাখে।

ডিজাইন খাতেই বাড়ছে কর্মসংস্থান

এআই নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও যুক্তরাজ্যের ডিজাইন খাত গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ডিজাইন কাউন্সিলের ‘ডিজাইন ইকোনমি ২০২৬’ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত দেশটির ডিজাইন খাত প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল ২৩ শতাংশ।

নির্মাণ, সেবা ও উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে মোট প্রায় ২২ লাখ ৭০ হাজার ডিজাইন-সম্পর্কিত কর্মসংস্থান রয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এ খাতে কর্মসংস্থানও প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।

যদিও এই পরিসংখ্যানের একটি বড় অংশ এআইয়ের বর্তমান প্রভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগের সময়ের, ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থানের তথ্য বলছে—ডিজাইন দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর চাহিদায় এআই এখনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি।

এআই হবে ‘অফিসের ইন্টার্ন’

সোসাইটি অব গার্ডেন অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার্সের প্রধান অ্যান্ড্রু ডাফ বলেন, তাঁর খাতের অনেক কর্মী এআই নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে বাস্তবে প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মীদের বাদ দিয়ে এআই ব্যবহারের চেয়ে প্রযুক্তিটিকে ‘অফিসের ইন্টার্নের’ মতো কাজে লাগানোর সম্ভাবনাই বেশি।

ডিজাইনাররা এআই ব্যবহার করে ধারণা তৈরি, কাজের প্রাথমিক ধাপ, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ ও বিভিন্ন বিকল্প তৈরির মতো ক্ষেত্রে সময় বাঁচাতে পারেন। ফলে সৃজনশীল সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন এবং চূড়ান্ত নকশার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় মানুষের ভূমিকা বজায় থাকতে পারে।

ডেবোরা ডটনের মতে, এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি নকশার সঙ্গে মানুষের তৈরি পণ্যের পার্থক্য শুধু বাহ্যিক চেহারায় নয়। উপকরণ, ফিনিশিং, উৎপাদন পদ্ধতি, সংযোজন ও রঙের মতো বিষয়গুলো বাস্তব পণ্যের গুণগত মান নির্ধারণ করে।

প্রযুক্তির সঙ্গে বদলেছে ডিজাইনের পেশা

ডিজাইন খাতে প্রযুক্তির প্রভাব অবশ্য নতুন নয়। কম্পিউটার-এডেড ডিজাইন বা সিএডি সফটওয়্যার জনপ্রিয় হওয়ার সময়ও অনেক প্রচলিত কাজ বিলুপ্ত হয়েছিল। তবে একই সঙ্গে নতুন ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছিল এবং খাতটি সম্প্রসারিত হয়েছিল।

ডটনের মতে, এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা ডিজাইনারদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তবে এআইকে ঘিরে উদ্বেগ একেবারে অমূলক নয়। কিংস ইনস্টিটিউট ফর এআই ও পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের ৫৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এআই ব্যাপক বেকারত্ব তৈরি করতে পারে। এরই মধ্যে বিভিন্ন খাতের ফ্রিল্যান্সাররা এআই দিয়ে তৈরি ভুল সংশোধন বা একঘেয়ে কাজের চাপ বাড়ার অভিজ্ঞতার কথাও জানিয়েছেন।

এআইয়ের চেয়েও বড় সমস্যা দক্ষ কর্মীর ঘাটতি

ডিজাইন কাউন্সিলের মতে, এআইয়ের প্রভাবের চেয়ে বর্তমানে দক্ষ কর্মীর ঘাটতিই ডিজাইন খাতের জন্য বড় সমস্যা। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে যুক্তরাজ্যে ডিজাইন ও প্রযুক্তি বিষয়ে জিসিএসই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের হার ৬৮ শতাংশ কমেছে।

ম্যাট হান্টারের মতে, ডিজাইন শুধু সৌন্দর্য তৈরির বিষয় নয়; মানুষের জন্য পণ্য ও সেবাকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। উন্নত উৎপাদন থেকে শুরু করে ডিজিটাল সেবা—প্রায় প্রতিটি খাতেই ডিজাইনের ভূমিকা রয়েছে।

এ কারণে ডিজাইন খাতে ভবিষ্যৎ কর্মী তৈরিতে স্কুল পর্যায় থেকেই বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা না গেলে ভবিষ্যতে এআই নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতিই বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।

সব মিলিয়ে এআই ডিজাইনারদের জন্য শুধু প্রতিযোগী নয়, নতুন সম্ভাবনারও দরজা খুলে দিচ্ছে। প্রযুক্তিকে কে মানুষের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করবে আর কে মানুষের সৃজনশীলতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাবে—ভবিষ্যতে ডিজাইন পেশার বড় পার্থক্যটি সম্ভবত এখানেই তৈরি হবে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.