যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা থেকে ৮৬ টন সোনা লন্ডনে সরাল নেদারল্যান্ডস

বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত সোনার বড় একটি অংশ যুক্তরাজ্যের লন্ডনে সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডি নেদারল্যান্ডশে ব্যাংক (ডিএনবি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্ক ও কানাডার অটোয়ায় থাকা ৮৬ টন সোনা লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে ‘ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা’।

ডিএনবির মতে, লন্ডনে সংরক্ষিত সোনা নিউইয়র্ক ও অটোয়ার তুলনায় দ্রুত ও সহজে লেনদেন করা যায়। ফলে কোনো সংকট দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত তার সোনার মজুত ব্যবহার করতে পারবে।

ডিএনবির প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লেইপেন বলেছেন, সোনার মজুত কখনো ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে না—এমনটাই তারা আশা করেন। তবে একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা ও প্রস্তুতি জোরদার করাও জরুরি।

নেদারল্যান্ডসের এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি শুধু সোনা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানোর ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় কোন কেন্দ্রকে সবচেয়ে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য মনে করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে।

লন্ডন বিশ্বের অন্যতম গভীর ও তারল্যপূর্ণ সোনার বাজার। ফলে সেখানে রাখা সোনা তুলনামূলক দ্রুত বিক্রি, ধার দেওয়া বা আর্থিক লেনদেনে ব্যবহার করা সম্ভব। সংকটের সময় কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা সোনাকে দ্রুত নগদ অর্থ বা অন্যান্য সম্পদে রূপান্তর করার প্রয়োজন হলে এই বাজার-সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ফরাসি ন্যাশনাল গোল্ড কাউন্টার-এর প্রেসিডেন্ট লরাঁ শোয়ার্টজের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রায় এক দশক ধরেই তাদের সোনার মজুতের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিকল্প সংরক্ষণকেন্দ্র বেছে নেওয়ার প্রবণতাও কিছু দেশের মধ্যে তৈরি হতে পারে।

২০২৫ সালের শেষ নাগাদ নেদারল্যান্ডসের মোট সোনার মজুত ছিল ৬১২ দশমিক ৪ টন, যার মূল্য ছিল প্রায় ৭২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো বা ৮৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার।

স্থানান্তরের আগে দেশটির মোট সোনার ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ নিউইয়র্কে এবং ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ অটোয়ায় ছিল। স্থানান্তরের পর দুই দেশেই নেদারল্যান্ডসের সোনার অংশ দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ করে।

অন্যদিকে লন্ডনে থাকা সোনার অংশ ১৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের ভেতরে সংরক্ষিত সোনার অংশ রয়েছে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি নেদারল্যান্ডস। বরং সোনার মজুতকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে আরও ভারসাম্যপূর্ণভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি লন্ডনের মতো উচ্চ-তারল্যসম্পন্ন বাজারে এর অংশ বাড়ানো হয়েছে।

তবে প্রশ্ন হলো পুরো সোনা কি শারীরিকভাবে সরানো হয়েছে? না। ডিএনবির তথ্য অনুযায়ী, ৮৬ টন সোনার স্থানান্তর আংশিকভাবে কেনাবেচার মাধ্যমে এবং আংশিকভাবে সরাসরি শারীরিক পরিবহনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে।

এর মধ্যে ২৭ টনের বেশি সোনা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জেইস্টে আনা হয়। একই পরিমাণ সোনা জেইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ সোনার বার গলিয়ে নতুন করে তৈরি করার প্রয়োজন হয়নি।

এই কৌশলের মাধ্যমে শারীরিকভাবে বিপুল পরিমাণ সোনা পরিবহনের ঝুঁকিও ভাগ করে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএনবি। পুরো কার্যক্রমটি চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

এটি কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থার সংকেত? এখানেই নেদারল্যান্ডসের সিদ্ধান্তের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

ডিএনবি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অনাস্থার কথা বলেনি। বরং তারা সোনার দ্রুত ব্যবহারযোগ্যতা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

তবে আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বিভাজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

গত কয়েক বছরে রাশিয়ার বৈদেশিক সম্পদ জব্দ, নিষেধাজ্ঞার বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ভূরাজনৈতিক বিভাজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তৈরি করেছে—বিদেশে রাখা রিজার্ভ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, প্রয়োজনে তা রাজনৈতিক ঝুঁকিরও মুখোমুখি হতে পারে।

এই বাস্তবতায় সোনার মতো সম্পদ কোথায় রাখা হচ্ছে, সেটিও এখন কৌশলগত সিদ্ধান্তে পরিণত হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের পদক্ষেপকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করলে এর প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।

ব্যাংকিং বিশ্লেষক জন প্লাসার্ডের মতে, নেদারল্যান্ডসের এই পদক্ষেপ মূলত সংকটের সময় সোনাকে দ্রুত ব্যবহারযোগ্য রাখার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে একই ধরনের পদক্ষেপ যদি আরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে নিউইয়র্ক দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোনা সংরক্ষণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের ভল্টে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে একাধিক দেশ যদি ধীরে ধীরে সোনা অন্যত্র সরিয়ে নেয়, তা প্রতীকীভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এদিকে নেদারল্যান্ডসের সিদ্ধান্তের সঙ্গে জার্মানির সাম্প্রতিক বিতর্কেরও মিল রয়েছে। বছরের শুরুতে জার্মানিতে নিউইয়র্কে সংরক্ষিত দেশটির সোনার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

তবে জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুন্দেসব্যাংক আপাতত নিউইয়র্ক থেকে সোনা সরানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। ব্যাংকটি জানিয়েছে, নিউইয়র্ক ফেড এখনো জার্মানির সোনা সংরক্ষণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

এতে বোঝা যায়, ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে রাখা সোনা নিয়ে এখনো অভিন্ন নীতি তৈরি হয়নি। কেউ ঝুঁকি ছড়িয়ে দিতে চাইছে, আবার কেউ বিদ্যমান ব্যবস্থাকেই কার্যকর মনে করছে।

সোনার বাজারে এর প্রভাব

বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সোনার মজুত বাড়াচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বৈদেশিক রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনার প্রয়োজন।

নেদারল্যান্ডসের ৮৬ টন সোনা স্থানান্তর নিজে থেকে বৈশ্বিক সোনার বাজারে বড় কোনো ঘাটতি তৈরি করবে না। কারণ এটি মূলত মালিকানা পরিবর্তন নয়, সংরক্ষণস্থল পরিবর্তন।

তবে এর প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে। যদি একাধিক কেন্দ্রীয় ব্যাংক একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সোনা রাখার পরিমাণ বাড়ায়, তাহলে লন্ডনসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সোনা বাজারের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কেন্দ্রগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি আস্থার প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

ডলার ব্যবস্থার জন্যও কি এটি সতর্কবার্তা?

সোনার মজুত পুনর্বিন্যাসকে সরাসরি ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বলা ঠিক হবে না। নেদারল্যান্ডস ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে সরে যাওয়ার কোনো ঘোষণা দেয়নি।

তবে সামগ্রিক প্রবণতাটি একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি সোনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে।

বিশেষ করে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংঘাত বা নিষেধাজ্ঞার পরিস্থিতিতে কোনো দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। সোনার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির ধরন ভিন্ন। তাই সংকটের সময় দ্রুত ব্যবহারযোগ্য এবং রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ স্থানে সোনা রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সামনে কোন দিকে যাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কৌশল?

নেদারল্যান্ডসের পদক্ষেপকে তাই শুধু একটি লজিস্টিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এটি বৈশ্বিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তিত ঝুঁকি-চিন্তার একটি উদাহরণ।

আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে প্রশ্ন ছিল—কোথায় সোনা সবচেয়ে নিরাপদে রাখা যাবে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন—সংকটের মুহূর্তে কোথা থেকে সোনা সবচেয়ে দ্রুত ব্যবহার করা যাবে?

লন্ডনের গভীর সোনা বাজার, ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নিকটবর্তী অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনে এর উচ্চ তারল্য নেদারল্যান্ডসের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগামী দিনে অন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কী করে। নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ যদি শুধু ঝুঁকি ছড়িয়ে দিতে সোনার অবস্থান পুনর্বিন্যাস করে, তাহলে এটি স্বাভাবিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই থাকবে। কিন্তু ইউরোপের আরও কয়েকটি বড় অর্থনীতি যদি নিউইয়র্ক থেকে সোনা সরানোর পথে হাঁটে, তাহলে সেটি যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকেত হয়ে উঠতে পারে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.