ইরানের ক্ষমতার দ্বন্দ্বই নির্ধারণ করতে পারে ট্রাম্পের যুদ্ধের সমাপ্তি

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ অবসানের পথ নিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে গভীর মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে বাস্তববাদী ও কূটনীতিপন্থি একটি গোষ্ঠী দ্রুত সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে কট্টরপন্থিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তির বিরোধিতা করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কৌশলকে সমর্থন করছে।

সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামো ব্যাপক চাপে পড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধও তেহরানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাস্তববাদী গোষ্ঠী মনে করছে, শক্ত অবস্থান থেকে এখনই একটি চুক্তিতে পৌঁছানো গেলে ইরানের জন্য তা বেশি লাভজনক হতে পারে।

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, যুদ্ধ কোনো না কোনো সময় শেষ করতেই হবে। ইরান যখন শক্তি ও মর্যাদার অবস্থানে রয়েছে এবং বিশ্ব তাদের বিজয় স্বীকার করছে, তখনই যুদ্ধ শেষ করা ভালো।

তবে কট্টরপন্থিদের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কোনোভাবেই আস্থা রাখা যায় না। অতীতের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা এবং আলোচনার সময় সামরিক হামলার ঘটনাগুলোকে তারা এর প্রমাণ হিসেবে দেখছে।

লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের মতে, কট্টরপন্থিরা মনে করছে, যুদ্ধে পুরোপুরি পরাজিত না হওয়াই এক ধরনের বিজয়। তাদের লক্ষ্য এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ভালো চুক্তি আদায় করা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করা।

ইরানের কট্টরপন্থি রাজনীতিকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন কোনো সমঝোতা শেষ পর্যন্ত তেহরানের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাদের অভিযোগ, সরকারের মধ্যপন্থি অংশ দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে অতিরঞ্জিত করে জনগণকে চুক্তি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করছে।

কট্টরপন্থি আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ-মানান রাইসি প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান সত্যিই অর্থনৈতিকভাবে অচলাবস্থায় পড়েছে, নাকি সরকারের মধ্যপন্থিরাই এমন পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরছে। তার মতে, দেশের সব অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য যুদ্ধকে দায়ী করা ঠিক নয়।

অন্যদিকে কট্টরপন্থি রাজনীতিক কামরান গাজানফারি চুক্তির পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির অবস্থানের বিরুদ্ধে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রকে যত ছাড়ই দেওয়া হোক, ওয়াশিংটন আরও দাবি তুলবে এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ চাইবে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল অবস্থানও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে তিনি ইরানকে নিয়ে আলোচনার কথা বলছেন, অন্যদিকে সামরিক চাপ ও কঠোর হুমকি অব্যাহত রেখেছেন।

সানাম ভাকিলের মতে, ট্রাম্পের এই পরস্পরবিরোধী বার্তা ইরানের কট্টরপন্থিদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির আড়ালে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ফলে ইরানের কট্টরপন্থিরা মনে করছে, ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়ার অর্থ হতে পারে আবারও প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া। এই অবস্থান দেশটির সংবাদমাধ্যম, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারব্যবস্থা, রাজপথের বিক্ষোভ এবং সামরিক কাঠামোর ওপর তাদের প্রভাবের মাধ্যমে আরও জোরালো হচ্ছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এখনো প্রকাশ্যে কোনো পক্ষের সঙ্গে পুরোপুরি অবস্থান নেননি। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি ও ভবিষ্যৎ সমঝোতার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো শিবিরকে সমর্থন করলে তার নিজের রাজনৈতিক বৈধতা ও নেতৃত্বের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সম্প্রতি তিনি সরকারের চাপ মোকাবিলার প্রশংসা করলেও দেশের দুর্বলতাগুলো দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এসব দুর্বলতা প্রকাশ্যে বেশি আলোচনা না করারও সতর্কতা দিয়েছেন, কারণ এতে ইরানের শত্রুরা উৎসাহিত হতে পারে এবং মিত্রদের মনোবল দুর্বল হতে পারে।

এ অবস্থায় ইরানের সামনে মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের কৌশল নেওয়া হবে, নাকি বর্তমান অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো হবে।

শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত শুধু যুদ্ধের গতিপথই নয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনার পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বও যুদ্ধ কখন এবং কীভাবে শেষ হবে, তার অন্যতম প্রধান নির্ধারক হয়ে উঠেছে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.