রাজস্ব আহরণকে নিছক প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণের পবিত্র ব্রত হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। এটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও দেশের প্রয়োজনেই এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে এনবিআর।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬’-এ এসব কথা বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উপস্থিত ছিলেন।
আহসান হাবিব বলেন, ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এনবিআরে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ চার মাস বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। এ সময়ে এনবিআর এ যাবৎকালের শেষ প্রান্তিকে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় করেছে।
তিনি বলেন, গত পাঁচ দশকে দেশের রাজস্ব প্রায় আড়াই হাজার গুণ বেড়েছে। একই সময়ে রাজস্ব আহরণের কাঠামোতেও বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে আমদানি শুল্ক থেকে মোট রাজস্বের ৫৫ শতাংশ আসত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ২৭ শতাংশে নেমেছে। এর অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশ উৎপাদনমুখী শিল্পযাত্রায় এগিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে আয়কর ও ভ্যাট মিলে মোট রাজস্বের ৭৩ শতাংশ জোগান দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদনির্ভর অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির মন্থরতা কাটিয়ে এটি রাজস্ব আহরণে একটি সুস্পষ্ট পুনরুদ্ধার।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎসে আয়কর কর্তনকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে এনবিআর বলে জানান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, নতুন খাতসহ উৎসে কর কর্তনে মাঠপর্যায়ে কঠোর মনিটরিং, সঠিক নীতির সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি করা হবে। পণ্য রপ্তানি, খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি, জুয়েলারি ব্যবসা, সম্পত্তি হস্তান্তর ও লভ্যাংশ আয়ের মতো খাতে রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অগ্রিম ও বকেয়া কর আদায়ে কর অঞ্চলগুলোতে মাসভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কর ফাঁকি শনাক্তে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ কৌশল ব্যবহার করা হবে। অনিবাসী করদাতাদের কর ফাঁকিও তদারকি করা হবে।
এছাড়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি দ্রুত সম্পন্ন, আদালতে বিচারাধীন উচ্চ রাজস্বের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অডিট নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। নিজস্ব জনবল ব্যবহার করে ফাঁকি দেওয়া কর উদ্ধার করা হবে বলেও জানান তিনি।
এ সময় ভ্যাট খাতে ভ্যাট জাল বাড়ানো, নিয়মিত রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন ভ্যাটদাতা শনাক্ত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন আহসান হাবিব।
তিনি বলেন, সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যে ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে ভ্যাটসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শুল্ক খাতে যথাযথ শুল্কায়ন ও দ্রুত পণ্য খালাস, বকেয়া আদায় ও মামলা নিষ্পত্তি, বন্ডের অপব্যবহার রোধ এবং সব ধরনের চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। পাশাপাশি নিলাম কার্যক্রমের গতি বাড়ানো হবে।
দেশে কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার পেছনে কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, দেশের অর্থনীতির বড় অংশ এখনো নগদনির্ভর ও অনানুষ্ঠানিক। ব্যবসায়িক লেনদেনেরও বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক।
তিনি বলেন, সাপ্লাই চেইনের অপর্যাপ্ত ডিজিটাইজেশন এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসংযোগের ঘাটতি রয়েছে। একই সঙ্গে এনবিআরের অটোমেশনও এখনো পূর্ণতা পায়নি।
এনবিআরের কর্মকর্তারা সীমিত লজিস্টিকস নিয়ে কাজ করছেন উল্লেখ করে আহসান হাবিব বলেন, রাজস্ব প্রশাসনে বিনিয়োগ প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের ব্যয় নয়; এটি সর্বোচ্চ প্রতিদান দিতে পারে এমন একটি বিনিয়োগ।
করদাতাদের জন্য পাঁচটি অঙ্গীকার তুলে ধরে আহসান হাবিব বলেন, এনবিআরের দৃষ্টিতে সব করদাতা সমান। করসেবা গ্রহণ সহজ করা হবে। আইনের পরিবর্তন হবে পূর্বানুমানযোগ্য এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে করা হবে।
তিনি বলেন, সামগ্রিক অটোমেশনের মাধ্যমে আইনের প্রতিপালন নিশ্চিত করা হবে এবং রাজস্ব প্রশাসনকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে এনবিআর সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি বিভাগ) সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে গেছে। অর্থনীতি আগের তুলনায় অনেক বড় ও বহুমাত্রিক হয়েছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু পুঁজি বা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি। এটি স্পষ্ট করে যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এখনো ব্যর্থতা রয়েছে। এটি পুরো ফাইন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেমের একটি ‘কালেক্টিভ ফেইলিউর’।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজস্ব প্রশাসনকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে করদাতাদের অধিকাংশ সেবা অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে। এনবিআরের কাছে থাকা গুরুত্বপূর্ণ ডেটার যথাযথ ব্যবহার করে ডেটা-ড্রিভেন রেভিনিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এর ফলে সৎ করদাতারা উপকৃত হচ্ছেন।
গত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সক্ষম এবং দক্ষ জনবল রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তারা যে কোনো অসাধ্য সাধন করতে পারেন।
সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত যেমন কম, তেমনি কর আদায়ে বিনিয়োগের পরিমাণও আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় কম। প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে এনবিআর মাত্র ২১ পয়সা খরচ করে। রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ব্যয়কে তিনি ‘ভালো বিনিয়োগ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অর্থসূচক/


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.