জার্মানি থেকে ৭০ হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে ৬টি সাবমেরিন কিনছে ভারত

জার্মানির কাছ থেকে ছয়টি উন্নত প্রচলিত সাবমেরিন কিনতে যাচ্ছে ভারত। এ জন্য প্রাথমিক বাজেট ধরা হয়েছে ৭০ হাজার কোটি রুপি।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সাবমেরিন ক্রয় সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির বৈঠক রয়েছে। সেই বৈঠকেই ‘প্রজেক্ট ৭৫ ইন্ডিয়া’ বা ‘পি ৭৫ ইন্ডিয়া’ নামের এই প্রস্তাবটি পাস হওয়ার কথা রয়েছে।

যদি ‘পি ৭৫ ইন্ডিয়া’ প্রস্তাবটি পাস হয়, তাহলে জার্মানির সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি প্রস্তুতকারী সংস্থা থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমের সঙ্গে যৌথভাবে এসব সাবমেরিন নির্মাণ করবে মুম্বাইভিত্তিক জাহাজ নির্মাণকারী সংস্থা মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের আওতায় কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এসব সাবমেরিন নির্মাণ করা হবে।

বিশ্বে দুই ধরনের সামরিক সাবমেরিন রয়েছে—পারমাণবিক সাবমেরিন এবং প্রচলিত সাবমেরিন। পারমাণবিক সাবমেরিন পরমাণু চুল্লি থেকে পাওয়া শক্তিতে চলে। এসব সাবমেরিনের আকার তুলনামূলক বড় এবং বারবার পানির ওপরে আসার প্রয়োজন হয় না। ফলে পারমাণবিক সাবমেরিন মাসের পর মাস পানির নিচে থাকতে পারে।

অন্যদিকে প্রচলিত সাবমেরিন পানির নিচে চলার জন্য ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক মোটর এবং ব্যাটারি চার্জ করার জন্য ডিজেল ইঞ্জিন ব্যবহার করে। পারমাণবিক সাবমেরিনের তুলনায় এসব সাবমেরিন আকারে ছোট ও কম শব্দযুক্ত হয়। তবে পানির নিচে থাকার সময় সীমিত।

ভারত জার্মানির সঙ্গে যে ছয়টি সাবমেরিনের জন্য চুক্তি করতে যাচ্ছে, সেগুলো টাইপ-২১৪ শ্রেণির সাবমেরিন। ‘এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন সিস্টেম’ বা এআইপি প্রযুক্তি থাকায় এ ধরনের সাবমেরিনকে উন্নত প্রচলিত সাবমেরিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টাইপ-২১৪ শ্রেণির এসব সাবমেরিন প্রচলিত সাধারণ সাবমেরিনের তুলনায় বেশি সময় সাগরের তলায় থাকতে পারে।

থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেম এবং মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেডের যৌথ অংশীদারত্বে যে উন্নত সাবমেরিনগুলো তৈরি হবে, সেগুলোর দৈর্ঘ্য হবে ২১৯ দশমিক ০৫ ফুট বা ৬৫ মিটার, প্রস্থ হবে ২১ দশমিক ২৩ ফুট এবং উচ্চতা হবে ২০ দশমিক ২২ ফুট।

সাবমেরিনগুলো এইচওয়াই-১০০ ফেরোম্যাগনেটিক ইস্পাত দিয়ে তৈরি করা হবে। ফলে এগুলোর চৌম্বকীয় স্বাক্ষর খুব সীমিত থাকবে। এতে শত্রু নৌবাহিনীর নজরদারি অনেকাংশে এড়াতে সক্ষম হবে এসব ডুবোজাহাজ।

এসব সাবমেরিনের অস্ত্রসজ্জার মধ্যে থাকবে ছয়টি ৫৩৩ মিলিমিটার টর্পেডো টিউব, হেভিওয়েট ব্ল্যাক শার্ক টর্পেডো, এসএম-২৯ এক্সোসেট জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাবমেরিনে ব্যবহারের উপযোগী ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের সংস্করণ।

জুলাই মাসে ভারতে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ফিলিপ অ্যাকারম্যান জানিয়েছিলেন, শিগগিরই ডুবোজাহাজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বহু প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে পাকিস্তান ও চীনের মোকাবিলা করা সম্ভব হবে ভারতের নৌবাহিনীর পক্ষে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে উন্নত প্রযুক্তির সাবমেরিনের আবেদন জানায় ভারতের নৌবাহিনী। আবেদনে সাড়া দিয়ে ছয়টি সাবমেরিন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয় এবং বিষয়টি ‘অ্যাকসেপ্টেন্স অব নেসেসিটি’ শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করে। সে সময় এ প্রকল্পের প্রাথমিক বাজেট ধরা হয়েছিল ৪৩ হাজার কোটি রুপি।

এর আগে আশির দশকের গোড়ায় জার্মানির সংস্থা হাউন্ডসওয়ার্ক-ডয়শে ওয়েরফ্টের কাছ থেকে চারটি ডিজেল-বিদ্যুৎ ডুবোজাহাজ কিনেছিল ভারতীয় নৌবাহিনী। প্রায় দেড় দশক আগে ফরাসি কোম্পানি ডিসিএনএসের সঙ্গে নকশা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চুক্তির ভিত্তিতে ছয়টি কলভরি সিরিজের স্করপেন ডুবোজাহাজ বানানো শুরু করেছিল ভারত। ওই প্রকল্পের নাম ছিল ‘প্রজেক্ট ৭৫’। ওই সিরিজের প্রথম স্টেলথ সাবমেরিন আইএনএস কলভরি ২০১৫ সালের অক্টোবরে নৌবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২০২০ সালের নভেম্বরে এ সিরিজের শেষ সাবমেরিন কমিশন পায়। এরপর গত পাঁচ বছরে নতুন কোনো ডুবোজাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীর হাতে আসেনি।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.