ইরানের অর্থনীতিতে সংকট তীব্র, ট্রাম্পের কৌশলে বাড়ছে চাপ

ইরানের অর্থনীতিতে বহুমুখী সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। দারিদ্র্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, পরিবারের ঋণের বোঝা, বেকারত্ব ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখাকে নিজেদের কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রোববার ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি আলোচনা করছে না; বরং দেশটির উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার দিকে ওয়াশিংটন নজর রাখছে। তার এই মন্তব্যের পর ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় ও আধা-সরকারি গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশটির সাধারণ মানুষের আর্থিক দুর্দশার চিত্র উঠে এসেছে। ইরানিয়ান লেবার নিউজ এজেন্সি (আইএলএনএ) জানিয়েছে, অনেক শ্রমিক নিয়মিত ঋণের চাপে রয়েছেন। তেহরানের ৩৫ বছর বয়সী এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, দৈনন্দিন যাতায়াত কিংবা সামান্য খাবার কেনার খরচ মেটাতেও তাকে এখন বিভিন্ন ক্রেডিট অ্যাপের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও অর্থনৈতিক সংকটের সামাজিক প্রভাব নিয়ে একাধিকবার সতর্ক করেছেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং আয়-বৈষম্য অব্যাহত থাকলে সামাজিক অসন্তোষও বাড়তে থাকবে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১২ মাসে ইরানে খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় ১৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে এর অর্ধেকেরও কম। ফলে প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এর মধ্যে সরকার জ্বালানি তেলের ওপর ভর্তুকি কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। অতীতে ইরানে জ্বালানির দাম বাড়ানোকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আলবার্ট বাঘজিয়ান আইএলএনএকে বলেন, ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে থাকা রোগীর মতো। তার মতে, জ্বালানির দামে বড় ধরনের ধাক্কা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ধারণা করছে, চলতি বছর ইরানের অর্থনীতি প্রায় ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। সংঘাতের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিই এর প্রধান কারণ। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত কোনো সমঝোতা হলেও অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান বিদেশে আটকে থাকা সর্বোচ্চ ২০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তেল বিক্রির অনুমতি পেলে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার এবং হরমুজ প্রণালির ফি থেকে আরও ৫ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার আয় হতে পারে। তবে এসব আয়ের প্রতিটি উৎসই ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র চাইলে এগুলো আবার বন্ধ করে দিতে পারে।

ঋণ করে খাবার-ওষুধ কিনছেন সাধারণ মানুষ

যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইরানে খাবার ও ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও কিস্তি ও ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আইএলএনএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিস্তিতে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা এখন আর স্বচ্ছলতার পরিচয় নয়; বরং এটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটের সতর্কসংকেত।

তেহরানের ২৯ বছর বয়সী এক খণ্ডকালীন সম্পাদক জানিয়েছেন, একসঙ্গে পুরো খরচ বহন করা সম্ভব না হওয়ায় তিনি একাধিক ক্ষুদ্রঋণ অ্যাপ ব্যবহার করেন। অন্য শ্রমিকরা জানিয়েছেন, তাদের আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িভাড়া এবং আরও ৪০ শতাংশ ঋণের কিস্তি পরিশোধে চলে যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এসব ক্রেডিট অ্যাপের ব্যবহার বাড়ছে। অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ও অস্থিতিশীল আয় তাদের ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে না পারলে জরিমানা ও অতিরিক্ত ফিও দিতে হচ্ছে।

তেহরানের বাসিন্দা হোসেইন বলেন, এসব জরিমানা ক্রমেই জমতে থাকে। অর্থের অভাবে কিস্তি পরিশোধ করতে না পারার ভয় সাধারণ মানুষের ওপর মানসিক চাপও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাড়ছে আবাসন ব্যয়

ইরানে আবাসন ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে আবাসন নির্মাণের খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাড়িভাড়াতেও। ফলে অনেক পরিবার কম ভাড়ার বাসস্থানের সন্ধানে শহরের প্রান্তবর্তী এলাকায় চলে যাচ্ছে।

তেহরান প্রদেশে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সর্বোচ্চ সীমা ২৭ শতাংশ নির্ধারণের চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হচ্ছে না। আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ জানিয়েছে, নির্মাণ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় আবাসন লেনদেনও স্থবির হয়ে পড়েছে।

শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যুদ্ধের মধ্যে সরকার শ্রমিকদের সমস্যার দিকে যথেষ্ট নজর দিচ্ছে না। বানে শহরের নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের প্রধান হাসান এজাতি বলেন, বিশেষ করে নির্মাণশ্রমিকরা অসহায় অবস্থায় পড়েছেন এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য এখন শুধু টিকে থাকা।

তার হিসাব অনুযায়ী, বানে শহরের নির্মাণশ্রমিকদের প্রায় অর্ধেকের কোনো স্বাস্থ্যবিমা নেই। অর্থের সংকটে কেউ কেউ সীমান্তপথে চোরাচালানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও জড়িয়ে পড়ছেন।

অর্থনৈতিক দুর্দশাকে চাপের হাতিয়ার দেখছে ওয়াশিংটন

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অর্থনৈতিক দুর্দশাকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত চাপের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার মধ্যে ওয়াশিংটন মনে করছে, সময় যত গড়াবে এবং ইরানের অর্থনীতি যত দুর্বল হবে, তেহরানের দর-কষাকষির সক্ষমতাও তত কমবে।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি বলেছেন, সময়ের সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কমে আসবে। কারণ, অন্যান্য দেশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এড়িয়ে বিকল্প পাইপলাইন তৈরির দিকে এগোচ্ছে।

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচও ইরানের অর্থনীতি দুর্বল করাকে দেশটির শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কার্যকর চাপ হিসেবে দেখছেন।

ইউরেশিয়া গ্রুপের মতে, কোনো চুক্তির মাধ্যমে ইরান কিছুটা আর্থিক স্বস্তি পেলেও জনগণের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসন্তোষ পুরোপুরি দূর হবে না। ফলে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সরকারের জন্য শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত থাকতে পারে।

চলতি বছরের ইরানের বাজেটে প্রকৃত সরকারি ব্যয় ৩৮ শতাংশ কমানো হয়েছে। তবে অর্থনীতিতে এখনো একটি বড় আশার জায়গা হচ্ছে তেল রপ্তানি। বাজেটে প্রতিদিন ১৭ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, প্রতি ব্যারেলের দাম ৫৫ ডলার ধরে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত গড়ে ১৬ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছিল ৮০ ডলারের কিছু ওপরে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ আরও কঠোর হলে এই আয়ের পথও সংকুচিত হতে পারে। জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে ইরানের খার্গ দ্বীপ থেকে কোনো তেল রপ্তানি হয়নি।

ইরানের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের বিপরীতে সাধারণ শ্রমিকদের দুর্দশার এই চিত্রকে দেশটির দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন শ্রমিক নেতারা। হাসান এজাতির ভাষায়, প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটিতে শ্রমিকদের জীবন যেন কেবল টিকে থাকার এক দীর্ঘ সংগ্রাম।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.