ইয়েন সংকটে জাপানের পাশে যুক্তরাষ্ট্র, নেপথ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতার শঙ্কা

জাপানি মুদ্রা ইয়েন মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৪০ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার পর এর দরপতন ঠেকাতে বিরল যৌথ পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল জাপানের অর্থনীতিকে সহায়তা করার জন্য নয়; বরং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেও এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে দুই দেশের সমন্বিত মুদ্রা হস্তক্ষেপের ফলে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক লেনদেন হওয়া মুদ্রা হওয়ায় ইয়েনের বড় ধরনের দরপতনের প্রভাব আন্তর্জাতিক অর্থবাজারেও পড়ে।

 

কী এই মুদ্রা হস্তক্ষেপ?

মুদ্রা হস্তক্ষেপ (Currency Intervention) হলো কোনো সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা করা।

এই ক্ষেত্রে ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইউরো বিক্রি করে ইয়েন কেনা শুরু করে। একই সময়ে জাপানও বাজার থেকে ইয়েন কিনে মুদ্রাটির মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করে

এর আগে ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকট এবং ২০১১ সালের তোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামির পরও জাপানের মুদ্রা বাজারে যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের সহযোগিতা করেছিল।

 

কেন এত দুর্বল হলো ইয়েন?

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অত্যন্ত কম সুদের হার এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে জাপানি মুদ্রা ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়েছে।

১৯৯০-এর দশক থেকে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ফেরাতে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে অতিনিম্ন, এমনকি ঋণাত্মক সুদের হার বজায় রেখেছে। এতে একদিকে রপ্তানি প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে এবং পর্যটক বেড়েছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বেড়েছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার প্রবৃদ্ধি, সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতি এবং কম সুদের হার একসঙ্গে ধরে রাখতে চাইলেও, বিশ্লেষকদের মতে সেই নীতিই ইয়েনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কোথায়?

বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের মূল উদ্বেগ জাপানের অর্থনীতি নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা।

ইয়েনের দরপতন অব্যাহত থাকলে জাপান নিজস্ব মুদ্রাকে রক্ষার জন্য বিপুল পরিমাণ মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করতে পারে। বর্তমানে জাপানের কাছে প্রায় ১ দশমিক ১১৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজ রয়েছে।

এ ধরনের বড় আকারের বিক্রি হলে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বেড়ে যেতে পারে এবং ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, তাই ইয়েনের অনিয়ন্ত্রিত পতন ঠেকানো যুক্তরাষ্ট্রেরও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

 

কতটা কার্যকর হবে এই উদ্যোগ?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌথ হস্তক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে ইয়েনকে কিছুটা শক্তিশালী করতে পারে। ইতোমধ্যে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের দর ১৬৩ থেকে প্রায় ১৫৭-এ নেমে এসেছে

তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে জাপানকে আরও মৌলিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুদের হার বাড়ানো।

বর্তমানে জাপানের নীতিগত সুদের হার ১ শতাংশ, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ হলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় এখনও অনেক কম। এই সুদের হারের বড় ব্যবধানই ইয়েনের দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জাপান যদি দীর্ঘদিনের নিম্ন সুদের নীতি থেকে সরে না আসে, তাহলে বাজারে সাময়িক হস্তক্ষেপের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে যাবে এবং অর্থনীতির মৌলিক বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত মুদ্রার দিক নির্ধারণ করবে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.