একসঙ্গে কাজ করলে ৪-৫ বছরে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে কাজ করলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ব্যবসায়ীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আবারও বৈঠকের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

শনিবার (১ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং এ তথ্য জানিয়েছে। এর আগে গত ৪ এপ্রিল একই ধরনের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সড়ক, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

উদ্যোক্তাদের দিক থেকে উপস্থিত ছিলেন প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, এপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ইনসেপ্টা গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মুক্তাদির, ডিবিএল গ্রুপের এমডি এম এ জাব্বার, প্যাসিফিক জিনস গ্রুপের এমডি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, বে ফুটওয়্যারের এমডি জিয়াউর রহমান, এসিআই লিমিটেডের এমডি আরিফ দৌলা, রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান, র‍্যাংগস গ্রুপের এমডি সোহানা রউফ চৌধুরী, ওয়ালটন হাই–টেক ইন্ডাস্ট্রিজের এমডি এস এম মাহবুবুল আলম, যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম, সালমা গ্রুপের এমডি চৌধুরী মোহাম্মদ হানিফ শোয়েব, মুন্নু সিরামিকের চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম ও আবুল খায়ের গ্রুপের ডিএমডি আবু সাঈদ চৌধুরী।

প্রেস উইংয়ের পাঠানো তথ্য অনুসারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কিছু সমস্যা রয়েছে, তবে সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে কাজ করলে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই সরকারের লক্ষ্য। বিদ্যমান অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সরকার যেমন উপলব্ধি করছে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও তা অনুধাবন করছেন। এসব সমস্যা সমাধানে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আবারও বৈঠকে বসবেন। তিনি বলেন, যত বেশি আলোচনা হবে, তত বেশি সমস্যা চিহ্নিত করা যাবে এবং কার্যকর সমাধানও বের করা সম্ভব হবে। দীর্ঘ সময় ধরে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমেই টেকসই সমাধান পাওয়া যায়।

সরকারের বয়স এখনো ছয় মাস হয়নি, এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মধ্যেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। প্রথম বৈঠকে যেসব সমস্যা তুলে ধরা হয়েছিল, তার অনেকগুলোরই সমাধান হয়েছে। নতুন করে যেসব বিষয় সামনে এসেছে, সেগুলো নিয়েও সরকার কাজ করবে।

বিডা সূত্রে জানা গেছে, প্রথম বৈঠকে আলোচিত ২৮টি সমস্যার মধ্যে ২১টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকি সাতটি বিষয় এখনো প্রক্রিয়াধীন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার একটি প্রাথমিক রূপরেখাও তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। এ লক্ষ্য অর্জনে কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে সরকার।

বৈঠকের পর যোগাযোগ করলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির গণমাধ্যমকে বলেন, এটা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক বৈঠকের অংশ। খাতভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধানে সরকার যে আন্তরিক ও সচেষ্ট, তা তাঁদের জানানো হয়েছে। উদ্যোক্তারাও সরকারের পদক্ষেপে আশ্বস্ত হয়েছেন। আবার বৈঠক হবে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

বৈঠকে গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকট নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন বলে সূত্রে জানা গেছে। বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলায় সাময়িকভাবে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ব্যবসায়ীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।

সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের জানানো হয়, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য তৃতীয় একটি এফএসআরইউ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের কাজ শুরু হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ২০২৮ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে স্থায়ী সমাধান আসবে বলে আশা করছে সরকার।

বৈঠক শেষে একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজন কথাও বলেছেন। তবে কেউ নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি। তবে দুই ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে আশ্বাস দিয়েছেন।

এসএমইকে রপ্তানিতে যুক্ত করার উদ্যোগ

বৈঠকে ছোট ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) সরাসরি রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় বলে বিডা সূত্রে জানা গেছে। বিডার সূত্রগুলো বলছে, পুঁজি ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি রপ্তানির সুবিধা নিতে পারে না বলে জানান ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে এসএমই খাতের পণ্য ব্যবহারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে মূল রপ্তানিকারকের নিশ্চয়তার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট এসএমই প্রতিষ্ঠানকে শুল্কের সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। এ–সংক্রান্ত নীতিমালা চূড়ান্ত করতে বিডার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা বিএসটিআইয়ের বাইরে বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপনের দাবিও জানান।

বিডার নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বৈঠকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রপ্তানি বহুমুখীকরণের পথনকশা, জ্বালানি পরিস্থিতি, এসএমই উদ্যোক্তাদের রপ্তানি বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং আরও কিছু নতুন বিষয় বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে। দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে এ ধরনের সংলাপ ও গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.