রাজধানীর যানজট নিরসন এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের উড়াল অংশের নির্মাণকাজ চীনের প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। তবে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক থেকে প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২৯ জুলাই) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের নির্ধারিত আলোচ্যসূচিতে প্রস্তাবটি রাখা হয়। তবে প্রস্তাবটিতে ত্রুটি থাকায় আলোচনা থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রত্যাহার করে নেয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। বৈঠকের আলোচ্যসূচি অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে প্রস্তাবটির অনুমোদন চাওয়ার কথা ছিল। তবে কিছু ত্রুটি থাকায় প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। ত্রুটি সংশোধন করে পরবর্তীতে প্রস্তাবটি আবার সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে।
জানা গেছে, ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প (লাইন-৫: নর্দান রুট) এর তৃতীয় নির্মাণ প্যাকেজের আওতায় হেমায়েতপুর থেকে আমিন বাজার পর্যন্ত প্রায় ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং নতুন বাজারের পর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় শূন্য দশমিক ৯ কিলোমিটার, অর্থাৎ মোট ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়াল মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে হেমায়েতপুর, বলিয়ারপুর, বিলামালিয়া, আমিন বাজার ও ভাটারায় পাঁচটি উড়াল স্টেশন নির্মাণ করা হবে।
মেট্রোরেল লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত হয়। পরে একই বছরের ২০ নভেম্বর প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১২ হাজার ১২১ কোটি ৪৯ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার ঋণ ২৯ হাজার ১১৭ কোটি ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা।
প্রকল্পটির মেয়াদ ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকার যানজট কমানো, পরিবেশের উন্নয়ন এবং দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময় সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎচালিত ও পরিবেশবান্ধব আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে।
পুরো প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাতালপথ এবং ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার উড়ালপথ। মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ৯টি পাতাল এবং ৫টি উড়াল স্টেশন নির্মাণ করা হবে। পুরো প্রকল্পের কাজ ১০টি নির্মাণ প্যাকেজে সম্পন্ন হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ নির্মাণকাজের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রাক-যোগ্যতা যাচাইয়ে ২৪টি প্রতিষ্ঠান দলিল সংগ্রহ করলেও ৬টি প্রতিষ্ঠান আবেদন জমা দেয়।
মূল্যায়নের পর চারটি প্রতিষ্ঠান প্রাক-যোগ্যতা অর্জন করে। পরে দরপত্র আহ্বান করা হলে তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কারিগরি মূল্যায়নে দুটি প্রতিষ্ঠান উত্তীর্ণ হয় এবং তাদের আর্থিক প্রস্তাব খোলা হয়।
দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির মূল্যায়নে চীনের রেলওয়ে গ্রুপ, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপের যৌথ উদ্যোগ সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল সিনোহাইড্রো করপোরেশন।
দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ভ্যাট ও আয়কর ছাড়া যৌথ উদ্যোগটির দর ২ হাজার ২৮৫ কোটি ৬৮ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে আয়কর যুক্ত করলে মোট চুক্তিমূল্য দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৭০ কোটি ৯৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮৬০ টাকা।
এর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় ৫৯০ কোটি ৫৮ লাখ ১৪ হাজার টাকা, জাপানি মুদ্রায় ৮৬ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার ৮০৬ এবং মার্কিন মুদ্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪০ সমপরিমাণ অর্থ রয়েছে।
এই নির্মাণকাজের দাপ্তরিক প্রাক্কলন ছিল ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৪৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা (ভ্যাট ও আয়কর ছাড়া)। সুপারিশ করা দরটি প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ বেশি, যা গ্রহণযোগ্য বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
প্রকল্পের মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে এই প্যাকেজের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৮৯০ কোটি ৮৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান সুপারিশ করা চুক্তিমূল্য সেই বরাদ্দের তুলনায় ৭৮০ কোটি ১৪ লাখ ১ হাজার ৫৯৪ টাকা বেশি।
জানা গেছে, প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করা হবে। সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে এই প্যাকেজের জন্য ৩ হাজার ১৭৪ কোটি ২২ লাখ ৪২ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দরপত্র মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার অনাপত্তি নেওয়া হয়েছে। পরে নির্বাচিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ প্রাক-চুক্তি আলোচনা শেষে চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কোনো সদস্য ভিন্নমত দেননি এবং প্রচলিত আইন, বিধি-বিধান ও ক্রয়বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে বলে প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে। ডিএমটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদের ৭৯তম সভায় ক্রয় প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থসূচক/



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.