একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তার রাজস্ব ব্যবস্থা। উন্নত অবকাঠামো, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, বিচারব্যবস্থা কিংবা টেকসই উন্নয়ন কোনোটিই শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা ছাড়া সুচারুরূপে পরিচালিত হতে পারে না। তাই কর প্রদান শুধু একটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়; এটি নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার এক ধরনের সামাজিক চুক্তি, যেখানে করদাতা রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রদান করেন এবং রাষ্ট্র তার বিনিময়ে জনসেবা, আইনের শাসন ও উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি জটিল রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, তুলনামূলক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা, শিল্পখাতে বিনিয়োগের গতি শ্লথ হওয়া, উচ্চ খেলাপি ঋণের পরিমাণ, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের মন্থরতা সব মিলিয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও আগের তুলনায় কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছে। এই বাস্তবতায় রাজস্ব আহরণের গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি ব্যবসার সক্ষমতা ও বিনিয়োগের পরিবেশ রক্ষা করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাজস্ব কেবল শক্তিশালী অর্থনীতির মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর ওপর ক্রমবর্ধমান রাজস্ব সংগ্রহের চাপ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে এসেছে, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য পূরণে আমরা কি এমন একটি কর প্রশাসন গড়ে তুলছি, যা ব্যবসাকে বিকশিত হতে সহায়তা করবে, নাকি এমন একটি প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরি করছি নাকি ব্যবসা সংকুচিত করে ফেলার মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি করছি?এই প্রশ্নটি শুধু ব্যবসায়ীদের নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতির ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
রাজস্ব প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বাস্তবতা হলো বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রাজস্ব একই অর্থনৈতিক চক্রের অংশ। ব্যবসা নতুন কারখানা স্থাপন করলে নির্মাণ খাত সক্রিয় হয়, যন্ত্রপাতি আমদানি হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, সরবরাহ চেইন সম্প্রসারিত হয় এবং পরবর্তীকালে লাভ, ভ্যাট, উৎসে কর ও শুল্ক সব ক্ষেত্রেই রাজস্ব বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে বিনিয়োগের পরিবেশ যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, উদ্যোক্তারা যদি সম্প্রসারণের পরিবর্তে ঝুঁকি কমানোর কৌশল গ্রহণ করেন, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো অর্থনীতির করযোগ্য কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে শুরু করে।
সুতরাং রাজস্ব ও বিনিয়োগকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়; বরং একই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরস্পর-নির্ভরশীল দুটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
প্রতিবছর জাতীয় বাজেটে এনবিআরের জন্য উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ নিজেই কোনো সমস্যা নয়। বরং একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য রাজস্ব বৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা উচিত। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতা, বিনিয়োগের প্রবণতা, ভোক্তা চাহিদা, আমদানি-রপ্তানির অবস্থা এবং করযোগ্য আয়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, আমদানি প্রবণতা, কর-জিডিপি অনুপাত, করভিত্তির সম্প্রসারণের সম্ভাবনা এবং ব্যবসায়িক আস্থার মতো সূচকগুলো সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় লক্ষ্যমাত্রা যত উচ্চ হবে, বাস্তবায়নের চাপও তত বেশি মাঠপর্যায়ে নেমে আসবে। সেই চাপ কখনো কখনো প্রশাসনিক আচরণেও প্রতিফলিত হতে পারে।
বাংলাদেশে গত এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখায় যে বহু অর্থবছরেই নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এর অর্থ এই নয় যে এনবিআর কাজ করছে না; বরং এটি ইঙ্গিত দেয় যে লক্ষ্য নির্ধারণের পদ্ধতি, করভিত্তির আকার এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে একটি ব্যবধান রয়েছে।
এই ব্যবধান যত বাড়ে, প্রশাসনিক চাপও তত বাড়ে। যখন একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল সংখ্যাগত লক্ষ্য পূরণের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই মাঠপর্যায়ে সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রবল চাপ তৈরি হয়। কর প্রশাসনের ক্ষেত্রেও এই মনস্তত্ত্ব কাজ করতে পারে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহের প্রচেষ্টা কখনো কখনো করদাতাকে সহযোগিতা” থেকে করদাতাকে যাচাই এবং শেষ পর্যন্ত করদাতাকে সন্দেহ করার সংস্কৃতিতে রূপ নিতে পারে।
এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সমালোচনা নয়; বরং একটি প্রশাসনিক বাস্তবতা, যা বিশ্বের বহু দেশেই লক্ষ্যভিত্তিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দেখা গেছে। একটি মৌলিক সত্য আমরা প্রায়ই ভুলে যাই রাষ্ট্রের রাজস্ব আসে ব্যবসা থেকে।
কারখানা উৎপাদন করে বলেই ভ্যাট আসে।
ব্যবসা লাভ করে বলেই আয়কর আসে।
আমদানি হয় বলেই শুল্ক আসে।
কর্মচারী নিয়োগ হয় বলেই উৎসে কর আসে।
অর্থাৎ ব্যবসা দুর্বল হলে রাজস্বও দুর্বল হবে। অর্থনীতিতে একটি মৌলিক নীতি হলো—Tax follows Economic Activity । অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত বৃদ্ধি পায়, কর আদায়ও স্বাভাবিকভাবে বাড়ে। বিপরীতভাবে যদি ব্যবসা বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, উৎপাদন সংকুচিত করে কিংবা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে, তাহলে রাজস্ব আহরণও দীর্ঘমেয়াদে স্থবির হয়ে পড়ে। অর্থাৎ কর প্রশাসনের চূড়ান্ত সাফল্য কেবল তাৎক্ষণিক রাজস্ব আদায়ে নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরিতে, যেখানে ব্যবসা সম্প্রসারিত হয় এবং করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।
অথচ বাস্তবে অনেক সময় এমন ধারণা তৈরি হয় যে কর প্রশাসনের প্রধান কাজ হলো ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করা। নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও সহযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে ব্যবসার ওপর প্রশাসনিক ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
আজ একটি মাঝারি বা বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের অর্থ বিভাগকে শুধু হিসাবরক্ষণ নয়, বরং আয়কর, ভ্যাট, উৎসে কর, শুল্ক, ব্যাংকিং বিধি, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, কোম্পানি আইন, শ্রম আইন, ডিজিটাল রিটার্ন, বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল, তথ্য যাচাই এবং নিয়মিত অডিট সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়। প্রশ্ন হলো এই অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স ব্যয়ের অর্থনৈতিক মূল্য কে বহন করছে? শেষ পর্যন্ত এই ব্যয় পণ্যের দামে, বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে এবং কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলে। অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যয়কে অনেক Hidden Cost of Regulation বা অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কারণ এটি সরাসরি কর নয়, কিন্তু ব্যবসার ওপর অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করে ।
কঠোরতা কি সর্বদা কার্যকর?
আইন প্রয়োগে কঠোরতা প্রয়োজন। কর ফাঁকি, ভুয়া চালান, কাল্পনিক ব্যয়, মিথ্যা রিটার্ন কিংবা সংঘবদ্ধ কর জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সৎ করদাতারাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু কর প্রশাসনের একটি মৌলিক নীতি হলো। অর্থাৎ অপরাধের ধরন অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া।
যদি একটি প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকি এবং একটি প্রতিষ্ঠানের অনিচ্ছাকৃত প্রশাসনিক ভুল দুটোকেই একই চোখে দেখা হয়, তাহলে ন্যায়বিচারের নীতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
আধুনিক কর প্রশাসন তাই ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। যারা ধারাবাহিকভাবে সঠিকভাবে কর পরিশোধ করেন, তাদের প্রতি প্রশাসনিক আচরণ সাধারণত সহযোগিতামূলক হয়। আর যাদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির সুস্পষ্ট ঝুঁকি বা প্রমাণ থাকে, তাদের ক্ষেত্রে কঠোরতা প্রয়োগ করা হয়।
উৎসে কর: একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জটিল ক্ষেত্র
উৎসে কর বা ধারা–১৪৭ নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক আলোচনা ও হৈচৈ চলছে । বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থায় উৎসে কর (Withholding Tax) রাজস্ব আহরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। আয় সৃষ্টির উৎসেই কর কর্তনের মাধ্যমে সরকার আগাম রাজস্ব নিশ্চিত করতে পারে, কর আদায়ের ঝুঁকি কমায় এবং কর প্রশাসনের দক্ষতাও বৃদ্ধি করে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই কোনো না কোনো রূপে এই ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে।
কিন্তু উৎসে করের কার্যকারিতা কেবল আইন কঠোর হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। এর সফলতা নির্ভর করে চারটি মৌলিক ভিত্তির ওপর—আইনের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক পূর্বানুমেয়তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ব্যবসার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য। এই চারটি উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে উৎসে কর রাজস্ব আহরণের কার্যকর মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসার জন্য একটি জটিল প্রশাসনিক দায়িত্বেও পরিণত হতে পারে।
বর্তমানে একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন শত শত, কখনো কখনো হাজার হাজার আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়। ভেন্ডর পেমেন্ট, কনসালটেন্সি ফি, পরিবহন ব্যয়, কমিশন, ভাড়া, প্রযুক্তি সেবা, সফটওয়্যার লাইসেন্স, ক্লাউড সেবা, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট, বিজ্ঞাপন ব্যয়, পেশাগত সম্মানী এবং অন্যান্য অসংখ্য অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে উৎসে করের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। প্রতিটি লেনদেনের জন্য করহার, অব্যাহতি, নিবন্ধন অবস্থা, দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি (যেখানে প্রযোজ্য), আইনি ব্যাখ্যা এবং প্রয়োজনীয় দলিল ভিন্ন হতে পারে। ফলে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত উৎসে কর ব্যবস্থাপনা বাস্তবিক অর্থেই একটি অত্যন্ত জটিল প্রশাসনিক কাজ।
এই জটিলতা আরও বেড়েছে ডিজিটাল ব্যবসা, আন্তঃসীমান্ত সেবা, সফটওয়্যার, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন এবং নতুন ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেন বৃদ্ধির ফলে। অনেক ক্ষেত্রেই আইন প্রযুক্তির পরিবর্তনের তুলনায় ধীরে বিকশিত হয়। ফলে একই লেনদেন নিয়ে করদাতা, নিরীক্ষক এবং কর কর্মকর্তার ব্যাখ্যায় পার্থক্য সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এনবিআর উৎসে কর প্রতিপালন আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। যথাযথ কর কর্তন, সময়মতো সরকারি কোষাগারে জমা এবং নির্ধারিত রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ নীতিগতভাবে অত্যন্ত ইতিবাচক। কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে কর কর্তন না করা, কর্তিত কর সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া অথবা জালিয়াতির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
তবে একই সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ- সব ধরনের ত্রুটির প্রকৃতি এক নয়। উৎসে কর ব্যবস্থায় প্রতিটি বিচ্যুতি ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকির ফল নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতায় উৎসে কর-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোকে বাস্তবতার বিচারে বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে ।
Penalty কি সব সমস্যার সমাধান ?
প্রশাসনিক বিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত সত্য হলো Higher penalties do not necessarily create higher compliance. অর্থাৎ জরিমানা বাড়ালেই কর পরিপালন বাড়ে না। বরং গবেষণা বলছে যদি করদাতা মনে করেন আইন জটিল; প্রশাসন অনিশ্চিত; সামান্য ভুলেও কঠোর শাস্তি হবে, তাহলে তারা অনেক সময় অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক হয়ে পড়েন। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ধীর হয়; ব্যবসার ব্যয় বাড়ে; বিরোধ ও মামলা বৃদ্ধি পায়; প্রশাসনের কাজও জটিল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, যদি করদাতা জানেন- ইচ্ছাকৃত অনিয়মে কঠোর শাস্তি হবে; কিন্তু অনিচ্ছাকৃত ভুল সংশোধনের সুযোগ রয়েছে; তাহলে স্বেচ্ছায় আইন মেনে চলার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। আধুনিক বিশ্বে কর প্রশাসনের দর্শন ধীরে ধীরে Enforcement-based Model থেকে Relationship-based Compliance Model-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ করদাতাকে সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে কর প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হয় সঠিক তথ্য প্রদান, স্বচ্ছ ব্যাখ্যা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির মাধ্যমে স্বেচ্ছায় কর পরিপালনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা। এতে প্রশাসনের ব্যয়ও কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্বও বৃদ্ধি পায় ।
উপসংহার
বাংলাদেশের সামনে আজ দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে রাজস্ব বাড়াতে হবে, অন্যদিকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের গতিও ধরে রাখতে হবে। এই দুই লক্ষ্য একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। স্বল্পমেয়াদে প্রশাসনিক কঠোরতা রাজস্ব বাড়াতে কিছুটা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাজস্ব নিশ্চিত করতে হলে করদাতার আস্থা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং স্বচ্ছ কর প্রশাসনের বিকল্প নেই। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য যেমন শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা প্রয়োজন, তেমনি একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থার জন্যও প্রয়োজন শক্তিশালী ও বিকাশমান ব্যবসায়িক খাত। তাই বাংলাদেশের আগামী দিনের কর প্রশাসনের মূল দর্শন হওয়া উচিত রাজস্ব সংগ্রহ নয়, রাজস্ব সক্ষমতা সৃষ্টি। কারণ ব্যবসা যত বিকশিত হবে, কর্মসংস্থান যত বাড়বে এবং অর্থনীতি যত সম্প্রসারিত হবে, রাজস্বও তত স্বাভাবিক ও টেকসইভাবে বৃদ্ধি পাবে। সেই আস্থাভিত্তিক কর সংস্কৃতিই বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজস্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে।
লেখক: মোঃ আল-আমিন ভূঞাঁ, র্অথনীতি বিশ্লেষক।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.