ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর এবার বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি আরবের জাহাজের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণা করেছে গোষ্ঠীটি।
হুথিদের এ ঘোষণার পর থেকেই লোহিত সাগরে সৌদি আরবগামী ও সেখান থেকে ছেড়ে আসা কয়েকটি তেলবাহী ট্যাংকার মাঝপথ থেকে ফিরে গেছে বলে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্যে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে দুটি সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবিও করেছে তারা।
হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারেয়া বলেন, হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বন্দর ও বিমানবন্দর অবরোধের প্রতিশোধ হিসেবেই এই নৌ অবরোধ ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি জানান, গোষ্ঠীটি ভবিষ্যতেও তাদের সামুদ্রিক অভিযান চালিয়ে যাবে।
অন্যদিকে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘোষণার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিজেদের জাহাজ ও সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুক্তরাজ্যের ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, বুধবার রাতে সৌদি আরবের আল-শাকিক উপকূলের কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে জাহাজে আগুন লাগলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের কাছে মাইন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামুদ্রিক ড্রোনসহ এমন সক্ষমতা রয়েছে, যা দিয়ে তারা পুরো প্রণালি বন্ধ না করেও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করতে পারে। একটি সফল হামলাই বীমা ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী বাব আল-মান্দেব প্রণালি সুয়েজ খালের প্রধান প্রবেশপথ। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত প্রায় ১২ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ৮ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেলও এ প্রণালি অতিক্রম করে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির সংকটের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ, নৌপরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে। এতে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের মাধ্যমে হুথিদের উত্থান ঘটে। এরপর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধ দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে ফেলেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এ সংঘাতে দেড় লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং দুই কোটিরও বেশি মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা এবার সরাসরি সৌদি আরবের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার কৌশল নিয়েছে। যদিও তারা বাস্তবে নিয়মিত হামলা চালাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে শুধু এই ঘোষণাই আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।



মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.