ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছেন ডান-বামপন্থী জনতাবাদী নেতারা

বিশ্বজুড়ে ডান ও বাম—উভয় ধারার জনতাবাদী রাজনীতিকদের মধ্যে একটি নতুন প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে তারা অভিযোগ করছেন, রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক অভিজাত গোষ্ঠী বা তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ তাদের দমন করার ষড়যন্ত্র করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল জনপ্রিয় করে তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে একাধিক জনতাবাদী নেতা নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মেইন অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী গ্রাহাম প্ল্যাটনারের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর তিনি দাবি করেন, তার প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনকে থামাতেই দলীয় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অভিজাতরা পরিকল্পিতভাবে তাকে টার্গেট করেছে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম নেতা নাইজেল ফারাজ ব্যক্তিগত অর্থায়ন সংক্রান্ত বিতর্কের মধ্যে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে উপনির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। তার দাবি, এটি ‘প্রতিষ্ঠানপন্থী’ শক্তির ষড়যন্ত্র এবং জনগণই তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

ফ্রান্সে অর্থ আত্মসাতের মামলায় দণ্ড বহাল থাকার পরও আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন কট্টর ডানপন্থী নেতা মেরিন লে পেন। তিনি মামলাটিকে ‘উইচ হান্ট’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন বলে বর্ণনা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব নেতা নিজেদের আইনি বা রাজনৈতিক সংকটকে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন যেন সেটিই প্রমাণ করে যে তারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছেন। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের বক্তব্য তাদের সমর্থকদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে।

জনঅসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর

বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক জনতাবাদী রাজনীতির উত্থানের পেছনে বাস্তব কিছু কারণও রয়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, অভিবাসন, বৈশ্বিকীকরণ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প, লে পেন ও ফারাজ এই অসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে বামপন্থী জনতাবাদী রাজনীতির একটি শক্তিশালী ধারা গড়ে তুলেছিলেন।

ট্রাম্পের কৌশলের প্রভাব

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে নিজের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে তুলে ধরে ট্রাম্প রিপাবলিকান সমর্থকদের আরও ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন।

তিনি নিজেকে ক্ষমতাসীন অভিজাতদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলই পরবর্তীতে তার নির্বাচনী প্রচারণাকে আরও শক্তিশালী করে।

এখন যুক্তরাজ্যে ফারাজ, ফ্রান্সে লে পেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকও একই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করছেন।

সমালোচকদের প্রশ্ন

তবে সমালোচকদের মতে, জনতাবাদী নেতারা জনগণের স্বার্থ রক্ষার দাবি করলেও অনেক সময় নিজেদের ব্যক্তিগত বা আইনি সংকট আড়াল করতেই ‘ডিপ স্টেট’ বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বর্ণনা ব্যবহার করেন।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, আগামী দিনে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নির্বাচন নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক কৌশল অন্যান্য দেশেও সমানভাবে কার্যকর হয় কি না। একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট হবে, জনতাবাদী আন্দোলনগুলো সত্যিই সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করছে, নাকি শেষ পর্যন্ত তাদের নেতাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানই বেশি শক্তিশালী করছে।

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.