বেক্সিমকোর ‘কাঁধে চড়ে’ বাজারের রুদ্ধশ্বাস দৌঁড়

দীর্ঘদিন ফ্লোরপ্রাইসের ঘেরাটোপে আটকে থাকা বেক্সিমকো লিমিটেড ফের যেন পুঁজিবাজারের চালকের আসনে ওঠে এসেছে। টাকা কিছু দিনের মূল্য সংশোধনের পর হঠাৎ ইউ টার্ন হয়েছে এ কোম্পানির শেয়ারে। আজ রোববার (২৮ জুন) নতুন সপ্তাহের প্রথম দিনে বেশ বড়সড় চমকই দেখিয়েছে কোম্পানিটি। এ দিন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কোম্পানিটি লেনদেনের সর্বোচ্চ অবস্থানটি দখল করে নেয়। সার্কিটব্রকারের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত হয় শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি। সামগ্রিক বাজারে পড়ে এর ইতিবাচক প্রভাব। এর প্রভাবে মূল্যসূচক ও লেনদেন-উভয় জায়গায় হয় বড় উল্লম্ফন।

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার বছর ফ্লোর প্রাইসের খাঁচায় আটকে থাকার পর গত ৯ জুন স্বাভাবিক লেনদেনে ফেরে বেক্সিমকো লিমিটেড। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর টানা পতনের মুখে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই শেয়ারবাজারে ফ্লোর প্রাইস বা শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন সীমা বেঁধে দিয়েছিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। যাতে শেয়ারের দাম বেঁধে দেওয়া ওই সীমার নিচে নামতে না পারে। বাজারে সূচকের পতন ঠেকাতে কৃত্রিম ওই ব্যবস্থা নেয় বিএসইসির তৎকালীন কমিশন। এর আগে ২০২০ সালের মার্চেও একবার ফ্লোর প্রাইস বসানো হয়েছিল বাজারে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ধাপে ধাপে এই ফ্লোর প্রাইস তুলে নিতে থাকে তৎকালীন কমিশন। কিন্তু চলতি বছরের ২৭ জুলাই পর্যন্ত বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংকের ফ্লোরপ্রাইস বহাল রাখা হয়। চলতি মাসে বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মোঃ মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর কোম্পানি দুটির উপর থেকে ফ্লোরপ্রাইস প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান প্রতিশ্রতি দেন, বাজারে আর কোনো দিন ফ্লোরপ্রাইস বা মূল্য নিয়ন্ত্রণের কোনো কৃত্রিম ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। বাজারকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়া হবে।

ফ্লোরমুক্তির প্রথম দিন থেকেই বাজারে বেক্সিমকোর শেয়ারে মূল্য সংশোধন চলতে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে চাপে আছে বেক্সিমকো গ্রুপ। গ্রুপটির কর্ণধার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ওই পরিবর্তনের পর থেকে জেলে আটক আছেন। তাঁর ছেলে শায়ান রহমান এবং গ্রুপের অনেক উর্ধতন কর্মকর্তা তখন থেকে দেশছাড়া। এমন পরিস্থিতিতে নানা সঙ্কটের মুখে বেক্সিমকোর বেশিরভাগ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে। কোম্পানিটি অনেক দিন ধরে তার আর্থিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করেনি। তাতে কোম্পানির বর্তমান অবস্থা নিয়ে সংশয় ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে বড় ধরনের মূল্য সংশোধনের কবলে পড়ে বেক্সিমকোর শেয়ার। টানা ১১ দিনের পতনের মধ্য দিয়ে ১১০ টাকা ১০ পয়সা থেকে বৃহস্পতিবার শেয়ারটির দাম ২৮ টাকা ৪০ পয়সায় নেমে আসে। প্রায় প্রতিদিনই শেয়ারটি সার্কিটব্রকারের শেষ সীমা তথা প্রায় ১০ শতাংশ হারে মূল্য হারায়।

আজও বাজারে মূল্য পতনের ধারাকে সঙ্গী করে লেনদেন শুরু হয় বেক্সিমকোর শেয়ারে। দিনের প্রথম লেনদেনটি হয় ২৫ টাকা ৬০ পয়সা দরে, যা আগের দিনের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কম। তবে হঠাৎই বাজারে এই শেয়ারে ক্রয়চাপ শুরু হয়, তাতে তর তর করে বাড়তে থাকে দাম। দিন শেষে এই শেয়ারের ক্লোজিং মূল্য দাঁড়ায় ৩১ টাকা ২০ পয়সা, যা আগের দিনের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। রোববার শেয়ারটির প্রথম ও শেষ লেনদেনের মধ্যে মূল্যের পার্থক্য ছিল প্রায় ২০ শতাংম।

বেক্সিমকোর চমকের দিনে আজ ডিএসইতে কোম্পানিটির ৩৯ কোটি ১৫ লাখ শেয়ার বিক্রি হয়েছে, যার মোট মূল্য ১০৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। বেক্সিমকোর লেনদেনের পরিমাণ ছিল বাজারের মোট লেনদেনের ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এদিন ডিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৭১ কোটি ৩ লাখ টাকা।

বেক্সিমকোর এমন ইউটার্নের ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারে। এদিন ডিএসইতে ১ হাজার ৩৭১ কোটি ৩ লাখ টাকা মূল্যের শেয়ার কেনাবেচা হয়। আগের দিনের তুলনায় লেনদেন বৃদ্ধি পায় ২৬০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বা ২৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

রোববার ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৬৬ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়েছে। সূচকের এই উল্লম্ফনেও বেক্সিমকোর পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নানা শর্ত পরিপালন করতে না পারায় বর্তমানে বেক্সিমকো ডিএসইএক্স সূচকের বাইরে আছে। তাই এই শেয়ারের মূল্য পরিবর্তন সরাসরি সূচকটিতে ভূমিকা রাখতে পারে না। কিন্তু রোববার শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি ও লেনদেনে কোম্পানিটি নেতৃত্ব দেওয়ায় তা বেশিরভাগ বিনিয়োগকারীকে বাজারের প্রতি উজ্জীবিত করে। তাদের আস্থা বৃদ্ধি পায়। আশাবাদী বিনিযোগকারীদের সক্রিয়তার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক বাজারে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাজারের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুবিধার্থে অবিলম্বে কোম্পানিটির উৎপাদন কার্যক্রম সংক্রান্ত তথ্যাবলী এবং আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা অপরিহার্য। কোম্পানিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ দায়িত্ব পালন না করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠবে।

 

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.