হরমুজে অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও দাম নিয়ে নতুন উদ্বেগ

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর হওয়ার পরও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ এবং জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা এলেও ততক্ষণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়ে গেছে। প্রায় চার মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ কার্যত ব্যাহত ছিল।

বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবে, এই সময়ের সংঘাত ও অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে প্রায় ১১৫ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ হয়নি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ বিদ্যমান মজুত থেকে তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখে।

এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক তেলের বাজার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির কৌশলগত তেল মজুত ১৯৯০ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি তেল মজুতও ৪৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম পর্যায়ে রয়েছে। বাণিজ্যিক মজুতও এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে সরবরাহ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “বিশৃঙ্খলা দেখতে চান? আমাদের যে মজুত আছে, তা দিয়ে আর চার সপ্তাহ চলবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য বর্তমান পরিস্থিতির বাস্তব চিত্রই তুলে ধরে। কারণ হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌচলাচল নিশ্চিত না হলে বৈশ্বিক মজুত আরও দ্রুত কমে যেতে পারে।

আবার বাড়তে পারে তেলের দাম

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করে। বর্তমানে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে অবস্থান করছে। অথচ সংঘাত চলাকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, দামের পতনের পেছনে যুদ্ধ-পূর্ব অতিরিক্ত সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সেই অতিরিক্ত মজুত এখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

গত কয়েক মাসে বিশ্বের তেলের মজুত প্রায় ১৯ কোটি ব্যারেল কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার গুরুত্বপূর্ণ তেল সংরক্ষণ কেন্দ্রেও চাপ তৈরি হয়েছে। অনেক সংরক্ষণাগারে তলানির অবশিষ্টাংশের কারণে পাইপলাইনের চাপ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সরবরাহ স্বাভাবিক হতে লাগতে পারে কয়েক মাস

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলেও সংকট তাৎক্ষণিকভাবে দূর হবে না। প্রথমে প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ, পরে খালি ট্যাংকার ফেরত পাঠানো, উৎপাদন পুনরায় শুরু এবং গন্তব্যে তেল পৌঁছাতে উল্লেখযোগ্য সময় প্রয়োজন হবে।

তেল শিল্প সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এ সময় বাজারকে বিদ্যমান মজুতের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

কেপলারের বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ সিএনএনকে বলেন, আগামী গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হতে পারে। বর্তমানে বাজার সমঝোতা চুক্তি নিয়ে আশাবাদী থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতিই বাজারকে প্রভাবিত করবে।

হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হলেও ১১৫ কোটি ব্যারেলের ঘাটতি পূরণ করতে প্রায় এক বছর সময় লাগবে।

তেল বিশ্লেষক ড্যান পিকারিং বলেন, “একটা সময় তেলের বাস্তব সরবরাহই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই তেলের সরবরাহ বাজারে না এলে তার প্রভাব পড়বেই।”

দাম কমও থাকতে পারে

তবে সব বিশ্লেষক একই মত পোষণ করছেন না। অনেকের ধারণা, অর্থনৈতিক চাপে থাকা ওপেকভুক্ত দেশগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে। ফলে বাজারে নতুন সরবরাহ যুক্ত হলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখা কঠিন হবে।

তেল ও গ্যাস বিশ্লেষক বিকাশ দ্বিবেদি বলেন, যুদ্ধের আগে বাজারে পর্যাপ্ত মজুত ছিল এবং সেই সুরক্ষার বড় অংশ ব্যবহার করা হলেও পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল মজুত ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকলেও তা পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় মাত্র ১২ দশমিক ৪ শতাংশ কম। একইভাবে পেট্রলের মজুতও আগের বছরের তুলনায় মাত্র ৫ শতাংশ কম।

বিকাশ দ্বিবেদি বলেন, “মজুতের সংকট বাস্তব, তবে অনেকে বিষয়টিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। কয়েক সপ্তাহ পর পরিস্থিতি বদলে গেলে বিক্রেতারাই তেল বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজবেন।”

অর্থসূচক/

  
    

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়.